আলোর রেখা, আঁধারের ছায়া

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫২ পিএম

দুই বছর পেরোল। ২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবরের নির্বাচনে যে কমিটি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) দায়িত্ব নিয়েছিল, সোমবার চার বছরের মেয়াদের অর্ধেক ফুরিয়েছে। এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে কমিটি সভায় বসে সাফল্য আর অসমাপ্ত কাজের হিসাব মেলাতে চেয়েছিল। দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে খাতা খুললে দেখা যায়—কোথাও ঝলমলে আলো, কোথাও থমকে থাকা অন্ধকার।

মেয়েদের হাত ধরে আলো আসছে, আবার ভাবনার রসদও রেখে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা ধরে রাখা গেছে, সেটা বিসর্জন দিতে হয়েছে চলতি বছর। ২০২৫ সালে প্রথমবার এএফসি নারী এশিয়ান কাপের টিকিট কেটেছে বাংলাদেশ। যদিও এশিয়ার মঞ্চটা সুখকর ছিল না। ফিফা র্যাংকিংয়ে দল ১২৮ থেকে উঠেছে ১০৪-এ। এখন অবস্থান ১০৬। ঘরোয়া নারী লিগে ১১ ক্লাব খেলেছে, লিগের মান নিয়ে অবশ্য যথেষ্ট প্রশ্ন ছিল। প্রতি একাদশে দুজন অনূর্ধ্ব-১৭ আর দুজন অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলার রাখার নিয়মে প্রতিভার সিঁড়ি বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা ছিল।

পুরুষ দলের গল্পটা ঢেউয়ের মতো। ফিফা র্যাংকিংয়ে দল এখন ১৮২তম, ইতিহাসে সর্বোচ্চ উঠেছিল ১১০-এ, সর্বনিম্ন নেমেছিল ১৯৭-এ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ভারতকে ১–০ গোলে হারানোর রাত ছিল উল্লাসের। অক্টোবরে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ২-৯ গোলের হার মনে করিয়ে দিল—এশিয়ার মঞ্চে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।

খেলোয়াড় তৈরির কারখানা সবচেয়ে বেশি ম্লান। পাইওনিয়ার লিগকে বলা হয় ফুটবলার তুলে আনার সূতিকাগার। সেখান থেকে উঠে এসেছিলেন মোনেম মুন্না, জুয়েল রানার মতো তারকা। কাগজে যার কাঠামো বড়সড়। কিন্তু বাস্তবে লিগ ২০২২ থেকে বন্ধ। বাফুফের নির্বাচনের পর দুই বছর কেটে গেছে, হাজী টিপু সুলতানকে চেয়ারম্যান করে গড়া পাইওনিয়ার লিগ কমিটি পূর্ণতা পায়নি। জেলা ফুটবলের চিত্র আরও করুণ। গত বছর ৬৪ জেলার পাঁচটি লিগ আয়োজন করেছে, বাকি ৫৯ জেলায় নীরবতা। কিছু জেলায় ১০-১২ বছর বাঁশি বাজেনি। নিয়মিত জেলা লিগের প্রতিশ্রুতি তাই এখনো মন ভোলানো বুলি।

পেশাদার লিগের বুকেও ফাটল। ২০২৫-২৬ মৌসুমের বাংলাদেশ ফুটবল লিগে খেলেছে ১০ ক্লাব, সূচি ছিল ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ মে পর্যন্ত। ক্লাবগুলোর বাজেট কমছে, প্রভাব পড়েছে মাঠের খেলায়। চলমান লিগের কিছু ম্যাচ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে—মান পড়ে গেছে। যে লিগের ভেন্যু ও সূচিতে ছন্দ নেই, সেখানে গ্যালারি ভরার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যায়।

অথচ দেশের ফুটবলে কিন্তু টাকার প্রবাহ থেমে নেই। এএফসি প্রতি বছর ৫ লাখ ডলার অনুদান দেয়। ২০২৫ থেকে ২০২৮ পর্যন্ত বাড়তি আড়াই লাখ ডলার করে পাবে বাফুফে, যা স্টেডিয়াম সংস্কার ও অবকাঠামোয় খরচ করার কথা। ফিফার ফরওয়ার্ড তহবিলের হিসাবে বরাদ্দের ৬৪.২ শতাংশ গেছে অবকাঠামোয়। এএফসি ২০২৬ সালে বাংলাদেশকে গ্রাসরুটস চার্টারের সিলভার স্তরের সদস্য করেছে, যা তৃণমূল আর কোচ উন্নয়নের স্বীকৃতি। কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যায়—এই টাকা কোথায় গেল, কত গেল, তার ফল কী হলো? লাইসেন্সিং নিয়মে ক্লাবকে দিতে হয় নিরীক্ষিত হিসাব, অথচ ফেডারেশন নিজে সেই আয়নার সামনে দাঁড়ায়নি। কতজন কোচ তৈরি হলেন, রেফারির মান কতটা বাড়ল, কোন মাঠ নতুন করে সাজল, এসবের যাচাইযোগ্য সংখ্যাও অনুপস্থিত।

সামনে আছে ২০২৮ পর্যন্ত রোডম্যাপ। তাতে এলিট খেলোয়াড় উন্নয়ন, নারী ফুটবল, লিগ, কোচিং, রেফারি, স্পোর্টস সায়েন্স আর প্রতিযোগিতা অগ্রাধিকার পেয়েছে। দিকনির্দেশনা আছে ঠিকই, কিন্তু সময়সীমা, বাজেট আর সাফল্য মাপার মানদণ্ড চোখে পড়ে না। পুরুষ ও নারী দলের জন্য সংখ্যাভিত্তিক র্যাংকিং লক্ষ্যও প্রকাশ্যে আসেনি। দুই বছরের হিসাব তাই দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে আছে যাচাইযোগ্য অগ্রগতি, নারীদের জয়গাথা। অন্যদিকে আছে জেলার নিস্তব্ধ মাঠ, থমকে থাকা পাইওনিয়ার, অনিয়মিত লিগ আর ঝাপসা হিসাবের খাতা।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর