মানুষের জন্য বাউয়েট’র সাদী মুহাম্মাদ তামিমের ছুটে চলা

: মোহাম্মদ অংকন
: ৪ সপ্তাহ আগে

‘ভিশন ২০৪১’কে সামনে রেখে টেকসই পৃথিবী গড়তে  Sustainable Development Goals (SDGs) সতেরোটি গোল নির্ধারিত হয়েছে। তন্মধ্যে  No Hunger, No Poverty, Quality Education অন্যতম। বাংলাদেশ সরকারও লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে কাজ করছেন। এবং ব্যক্তি-উদ্যোগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী নানা সংগঠনকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে কাজ করছে চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়ার তরুণ সাদী মুহাম্মাদ তামিমের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সিংড়া স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশন’। সংগঠনটি মূলত উপরোক্ত তিনটি লক্ষ্য নিয়ে ২০১৬ সাল থেকে কাজ করছে। চলনবিল অঞ্চলের মানুষের ক্ষুধা নিবারণ, দারিদ্রতা দূরীকরণ ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে কর্মসূচি পালন করে। এসবের মধ্যে দুস্থ শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়াশোনা করার সুযোগ করে দেওয়া অন্যতম।

সংগঠনটির উদ্যোক্তা সাদী মুহাম্মাদ তামিম তার উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে জানান, সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবছর ইদের আগে দরিদ্র মানুষকে নতুন জামা-কাপড় ও প্রয়োজনীয় খাদ্যের যোগান দিয়ে থাকে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস আসার পর সংগঠনের উদ্যোগে বারোজন পরিবারের জন্য প্রতিমাসের খাবার ব্যবস্থা করে, নগদ টাকা প্রদান করে। উক্ত সংগঠন থেকে এযাবৎ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪০০০জনকে সাহায্য করতে পেরেছে। দারিদ্র দূরীকরণে সংগঠনটি অসহায় মানুষকে ভ্যান-রিকশা কিনে দিয়ে, দোকান করে দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায়।

‘সিংড়া স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশন’র ব্যানারে ২০১৭ সালে তামিমের নেওয়া একটি উদ্যোগ সেসময় বহু মানুষের নজর কাড়ে ও গণমাধ্যমে বহুল প্রচারিত হয়। তিনি তার টিমকে সাথে নিয়ে পায়ে হেঁটে সিংড়া উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিজান চালান। অভিজানের অংশ হিসেবে উপজেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের কুফল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবগত করেন। এ কাজ করতে গিয়ে তামিম মাদসসেবীচক্রের কাছ থেকে মৃত্যুর হুমকির শিকার হন। একপর্যায়ে পুলিশের সহযোগিতায় তিনি বেঁচে যান।

তামিম বলেন, ‘নানা বাধা উপেক্ষা করে আমি আমার কার্যক্রম এখনও চালিয়ে যাচ্ছি। সংগঠনকে সাথে নিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য উপজেলার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেডিকেল বক্স প্রদান করেছি। সেখান থেকে তারা বিনামূল্যে ঔষধ সেবা পায়। ‘‘বঙ্গবন্ধু’’ নামে একটি ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি করেছি। সেখান থেকে তরুণরা বিনামূল্যে বই নিয়ে পড়তে পারে। এবং পড়া শেষ করে ফেরত দেয়। আমাদের এসব কাজে স্বয়ং আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক মহোদয় উৎসাহ দেন। এটি আমাদের জন্য বিশাল প্রাপ্তি।’

সাদী মুহাম্মাদ তামিম চব্বিশ বছরের তরুণ। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছেন। তারা দুই ভাই। বাবা-মা উভয়ই সরকারি চাকরিজীবী। চাকরিজীবী পরিবারের সন্তান হয়ে তামিম কেন সামাজিক ও মানবিক কাজে নিজেকে জড়ালেন, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একদিন এক ভিক্ষুককে দেখি আরেক ভিক্ষুককে ভিক্ষা দিচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে আমার মাথায় আসে, একজন ভিক্ষুক যদি আরেক ভিক্ষুককে সাহায্য করতে পারে, আমি বা আমরা কেন পারব না? আর তারপরই মানুষের জন্য কাজ করার ব্রত নিয়ে গড়ে তুলি সংগঠনটি।’

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি পরিচালনা করতে গিয়ে তামিম নানান প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো সঞ্চয় না থাকায় মানুষকে সাহায্য করতে গিয়ে থমকে যেতে হয়। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় অনেক কিছু করতে পারে না। সমাজের প্রতিষ্ঠিতদের কাছে হাত বাড়ালে বেশিরভাগ সময় সাহায্য মেলে না।

তামিম তাদের ইচ্ছের কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের ইচ্ছে, পুরো দেশের না পারলেও চলনবিলের কোনো মানুষ যেন অনাহারে না থাকে এবং কোনো শিক্ষার্থী যেন অভাবের কারণে পড়ালেখা বন্ধ করতে না পারে। আমরা টেকশই শহর করার জন্যও শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় নানাভাবে তাদের সাহায্য করি। বন্যাকবলিত এলাকায় সবাইকে সাহায্য করে থাকি। এবং করোনাকালে আমরা ৪০,০০০ মাস্ক বিতরণ করেছি।’

তামিমের নেতৃত্বে ‘সিংড়া স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশন’-এ কাজ করেন শোয়েব মুহাম্মদ, মির্জা শাফি কালাম, এম. আর. কানন, নাফিজ ইকবাল, সম্রাট হোসেনসহ ত্রিশজনেরও অধিক তরুণ যাদের মূল লক্ষ্য সুন্দর একটি ক্ষুধা, দারিদ্র ও নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা।