লক্ষ্মীপুরের সফল ফ্রিল্যান্সার নাঈমের গল্প


আইটি ডেস্ক প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৫, ২০২২, ৩:১৩ পূর্বাহ্ণ / ১০৭
লক্ষ্মীপুরের সফল ফ্রিল্যান্সার নাঈমের গল্প

চেষ্টা আর অদম্য ইচ্ছা শক্তি বদলে ফেলতে পারে জীবনের মোড়, আবারও প্রমাণ করে দিলেন লক্ষ্মীপুরের সফল ফ্রিল্যান্সার নাঈম হোসাইন শুভ। তার ভাষ্যমতে, সফলতা কখনও হেঁটে হেঁটে আসে না, ধীরে ধীরে সফলতার ভীত রচনা করতে হয়। আর তবেই সম্ভব হয়ে ওঠে অন্ধকার জীবনে এক ফোটা সূর্য রশ্মির। তার বিশ্বাস– সময়ের সাথে সাথে তিনি একদিন দশের সেরা হয়ে উঠবেন এবং তার সফলতার গল্প বর্তমান তরুণ সমাজের অনুপ্রেরণার কারণ হবে। আর ঠিক হয়েছে তাইও। নাঈম হোসাইন শুভর সফলতার বিস্তারিত গল্প জানাচ্ছে বাংলাদেশ চিত্র’র আইটি ডেস্ক।

ফ্রিল্যান্সিং জীবনের সূচনা

সময়টা ছিল ২০১১, সবেমাত্র ভার্সিটি লাইফে পা রাখা। এরইমধ্যে হঠাৎ মাথা ছাড়া দিয়ে ওঠে রোজগারের চিন্তা। বাবার ইচ্ছা হয় ছেলের কিছু একটা করা উচিত, যেটা তাকে স্বাবলম্বী করে তুলবে। এদিকে পরিবারের অনুপ্রেরণায় তার নতুনত্ব জানার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তিনি মনে করেন- তার জন্য কম্পিউটার শিক্ষা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। পরিবার তাকে সম্মতি দেয় এবং কম্পিউটার শেখার জন্য তিনি শুরুতে একটা কোর্স কমপ্লিট করেন। এরপর আরও কিছু কোর্স–এ ভর্তি হন এবং ধারাবাহিকভাবে সেগুলোও সম্পন্ন করেন। কিন্তু কোর্স কমপ্লিট-এর পরবর্তী সময়ে তিনি খুব বেশি খুশি ছিলেন না। কেননা সেখান থেকে তিনি তেমন কিছু আয়ত্ত করতে পারেননি, যা তাকে রোজগারের একটা মাধ্যম খুলে দিতে সক্ষম হবে। পরবর্তীতে নিজের অদম্য ইচ্ছা শক্তি আর রিসার্চের মাধ্যমে তিনি একের পর এক প্ল্যাটফর্ম খুঁজে বের করেন এবং টেকনিক খাটিয়ে প্রতিটা বিষয়ের স্কিল অর্জন করেন এবং সফলতা নিয়ে আসেন। এমনকি ইউটিউব কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অ্যাওয়ার্ড হিসেবে তিনি একটা সিলভার প্লে-বাটন গিফট পান। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ আইসিটি মন্ত্রণালয় থেকে সরকারিভাবে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছেন সাথে ১টি ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ডের সম্মাননাও পেয়েছেন। যেটা তাকে আরও বেশি এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি একাধারে একজন ইউটিউবার, আবার একাধারে একজন ফ্রিল্যান্সার। বর্তমানে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে যার নাম লক্ষ্মীপুরজুড়ে।

নাঈমের ব্যক্তিগত জীবন

ফ্রিল্যান্সার নাঈম হোসাইন শুভ লক্ষীপুরের ছেলে। ছোট থেকে বেড়ে ওঠা সেখানেই। পরিবারের রয়েছে তার মা-বাবা এবং ভাই-বোন। ভাই-বোনের সংখ্যা তিন। তিনিই পরিবারের বড় সন্তান। বর্তমানে তার বাবা পেশায় একজন ব্যবসায়ী এবং মা একজন গৃহিণী।

ফ্রিল্যান্সার নাঈমের টার্নিং পয়েন্ট

সফলতার পথ সর্বদা কষ্টের হয় সেটা আবারও প্রমাণ করে দিলেন ফ্রিল্যান্সার নাঈম। তিনি তার ফ্রিল্যান্সিং জীবনে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন, বারবার মানুষের নিন্দনীয় কথা শুনেছেন, তার দ্বারা কিছু হবে না, অনলাইন প্লাটফর্মে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলা একটা ফালতু বিষয়, এমন মন্তব্যেরও সম্মুখীন হয়েছেন দীর্ঘ সময়জুড়ে। তবে আজকের এই স্থান তিনি পেয়েছেন, তার ইচ্ছাশক্তি, চেষ্টা আর অধ্যবসায়ের জোরে। তিনি যখন পড়াশোনা করতেন, তখন তার বাবা প্রবাসী ছিলেন। তাই পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে তার বেশ কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। তবে সব কিছু মিলিয়ে সকল প্রতিকূলতাকে পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছেছেন আজকের এই অবস্থানে।

ফ্রিল্যান্সার নাঈমের বক্তব্য

তিনি বলেন– আমি যখন আমার ফ্রিল্যান্সিং জীবন শুরু করি, তখন শিকার হতে হয়েছে নানা বিরূপ পরিস্থিতির। ফ্রিল্যান্সিং জীবনের প্রথম কাজটা আমি করেছিলাম PTC সাইট নিয়ে। আমার প্রথম রোজগারের অ্যামাউন্ট ছিল মাত্র এক ডলার। এর পরবর্তীতে ডাটা এন্ট্রির কাজ শুরু করি। ধীরে ধীরে রোজগারের পরিসীমা বাড়তে থাকে। কিন্তু এরইমধ্যে আবার বেশ কিছু কাজে টাকা ইনভেস্ট করেছিলাম, অথচ প্রত্যেকটাই লস চলে যায়। ফলে পেতে হয় বেশ ধাক্কা। কিন্তু আমি ছিলাম প্রচণ্ড এনালাইসিস প্রিয় একজন মানুষ। আর তাই অনলাইন প্লাটফর্মে নিজের একটা ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য ধীরে ধীরে খুঁজে বের করি নানা মাধ্যম, যেটা আমাকে হিউজ পরিমাণ টাকা ইনকাম করতে সাহায্য করবে- সেই সাথে এনে দেবে দারুন সফলতা, পূরণ হবে মনের মাঝে জমে থাকা স্বপ্ন। যার মাধ্যমে আমার ক্যারিয়ার উজ্জ্বল হবে।

আমি মূলত ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, এসইও, ফেসবুক মার্কেটিং, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, ইউটিউব মার্কেটিং, ভিডিও ক্রিয়েটর, কনটেন্ট রাইটিং, ভিডিও এডিটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, সেলস মার্কেটিং ইত্যাদি বিষয়ে প্রচুর স্টাডি করেছি এবং বিভিন্ন কোর্স কমপ্লিট করেছি। তবে প্রত্যেকটা বিষয়ে আমার স্কিল থাকলেও আমি আমার জীবনে প্রফেশনালি বেছে নিয়েছি এফিলিয়েট মার্কেটিংকে। আর এর কারণ অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং-এর প্রতি আমার আলাদা একটা ভালো লাগা ছিল। সত্যি বলতে অল্প সময়ের মধ্যে এই মাধ্যমে আমি সফলতাও অর্জন করতে পেরেছি।

মূলত এর একটাই কারণ কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর হার না মেনে নেওয়া এবং অদম্য ইচ্ছা শক্তি। আমি সর্বদা এটা বিশ্বাস করতাম– কষ্ট করলে একদিন সেই কষ্টের ফল অবশ্যই সুমিষ্ট হবে। হয়েছেও তাই। তবে এফিলিয়েট মার্কেটিং-এর পাশাপাশি মানুষের কাছে কিছু মেসেজ পৌঁছানোর জন্য এই কাজগুলো সম্পর্কে তাদের জানানোর জন্য শুরু করি ইউটিউব মার্কেটিং। বর্তমানে আমার একটা এক লক্ষ নব্বই হাজার প্লাস সাবস্ক্রাইবার-এর ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে, যার নাম বেস্ট অফার। আমি যখন এফিলেট মার্কেটিং শুরু করেছিলাম, তখন মার্কেটিং রিলেটেড নাম ডিসাইড করি আর তারপরে শুরু করে দিই আমার ইউটিউব জীবন। উদ্দেশ্য একটাই- বেস্ট অফারগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানো। এমনকি ইতোমধ্যে ইউটিউব কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অ্যাওয়ার্ড হিসেবে আমি একটি সিলভার প্লে-বাটন গিফট পেয়েছি। স্বপ্ন আছে সামনে আরও অনেক দূর যাবার। সেই সাথে স্বপ্ন আছে দেশ ও মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখার।

শুরুতে যখন আমি বারবার ব্যর্থ হয়েছিলাম, তখন হজম করতে হয়েছে আপন মানুষদের অবহেলা, আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীর নানা কটুক্তি। যেগুলো বারবার আমাকে দুমড়ে-মুছড়ে ফেলছিল। কিন্তু আমি ছিলাম প্রচণ্ড জেদি, আর আমার লক্ষ্য ছিল সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো। অবশেষে জেদ, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা এবং রাব্বুল আলামিনের অশেষ কৃপায় আমি সফলতা অর্জন করতে পেরেছি। তাই সব কিছুর জন্য আলহামদুলিল্লাহ, যে আমি আজ লক্ষ্মীপুরের একজন সফল ফ্রিল্যান্সার।

ফ্রিল্যান্সিং কেন করবেন

ফ্রিল্যান্সিং একটা ক্রিয়েটিভ পেশা। বর্তমানে অনলাইন প্লাটফর্মে এমন অনেক অনেক মাধ্যম রয়েছে যেখানে নিজেদের স্কিল এবং শ্রম দিয়ে আর্থিক অবস্থার বদল ঘটানো সম্ভব। আর তাছাড়া এটা এমন একটি মাধ্যম যা বর্তমান তরুণ সমাজের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তার চাইতে বড় কথা, কেউ যদি নিজের সবটা দিয়ে চেষ্টা করে এবং নিজেদের প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলতে পারে তাহলে এই মাধ্যমে ইনকাম করার জন্য কোনরকম ইনভেস্টমেন্ট-এর প্রয়োজন পড়ে না। তাই যারা আর্থিক অসচ্ছলতা থেকে বের হয়ে আসতে চায় এবং নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপান্তর করতে চায় তাদের জন্য অবশ্যই ফ্রিল্যান্সিং আশীর্বাদস্বরূপ।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ফ্রিল্যান্সার নাঈমের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের জন্য দশের জন্য এমন কিছু করা, যেটা মানুষের উপকারে আসবে। তিনি তার জীবনে এমন কিছু করতে চান, যেটা বর্তমান তরুণ সমাজের জন্য অনেক বেশি হেল্পফুল হবে। সেই সাথে তার উদ্দেশ্য, আরও আরও জ্ঞান আহরণ করা। তিনি মনে করেন জানার কোন শেষ নেই এবং শিক্ষার কোনো বয়স নেই। তাই তিনি ফ্রিল্যান্সিং জীবনে আরও অনেক অনেক বিষয় সম্পর্কে স্কিল অর্জন করতে চান। তিনি এতটাই রিসার্চ প্রেমী যে তার নতুনত্ব জানতে খুঁজে বের করতে অনেক বেশি ভালো লাগে। এজন্য তিনি তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান ক্রিয়েটিভ মাইন্ডের প্রসার ঘটাতে চান এবং দেশের জন্য যাতে ভালো কিছু করতে পারেন সেই নিয়তেই এগিয়ে যেতে চান। সকলের কাছে তিনি দোয়া প্রার্থী। তিনি এটা মন থেকে বিশ্বাস করেন– একটা মানুষের প্রতি দোয়া এবং ভালোবাসা তার জীবনে অন্যতম অভিজ্ঞতার সাক্ষাৎ করাতে সক্ষম।

নতুনদের জন্য পরামর্শ

নানা প্রতিকূলতা পারি দিয়ে অভিজ্ঞতার আলোকে নতুনদের উদ্দেশ্যে তিনি কিছু কথা বলেছেন। তার মতে কোনো মানুষ চেষ্টা করলে বিফলে যাবে না। যে চেষ্টা করবে সে সামনের দিকে আগাবে, আর যে অল্পতেই ভেঙে পড়বে সে সেখানেই মিলিয়ে যাবে। তাই কেউ যদি ফ্রিল্যান্সিংকে নিজের পেশা হিসেবে নিতে চায় তাহলে অবশ্যই তাকে ক্রিয়েটিভ মাইন্ডের হতে হবে এবং পরিশ্রমী হতে হবে। এরমধ্যে ভাগ্য বলে একটা কথা আছে, তাই ভাগ্যও থাকতে হবে অবশ্যই। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রত্যেককে পরিশ্রমের ফলস্বরূপ যেকোনো কিছু উপহার হিসেবে দিয়ে থাকেন। তাই পরিশ্রমের ওপরে কোনো কিছু নেই। 

তিনি জানান- খারাপ সময় আসবে, মানুষ কটু কথা বলবে, তবুও উঠে দাঁড়াতে হবে। আর এটা শুধু একবার নয় বারবার। আর ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, এটা তরুণ-তরুণীদের অন্যতম হাতিয়ার। তাই ফ্রিল্যান্সিং জীবন গড়ে নেওয়া এক সম্ভাবনার সুযোগ। আর তাছাড়াও প্রতিকূলতা মানুষকে বাস্তবতা শেখায়। বাস্তবতা অনুভব করে নিজেকে সময়ের সাথে সাথে বদলাতেই হবে। আর যদি এটা সম্ভব না হয় তাহলে সেই সময় তাদের জন্য নয়। মেইন কথা হচ্ছে– যতটা সম্ভব নিজের স্কিল বাড়াতে হবে, মেধা খাটাতে হবে, কষ্ট যন্ত্রণা অপমান সহ্য করতে হবে, কিন্তু লেগে থাকতে হবে। তবেই সম্ভব একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হওয়া।