কলেজ জীবন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয়তাবাদী আদর্শের রাজনীতিতে এক অবিচল, সাহসী ও লড়াকু নাম মো: মিজানুর রহমান শরীফ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক এই যুগ্ম সম্পাদকের পুরো রাজনৈতিক জীবনটাই কেটেছে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, তীব্র নির্যাতন, কারাবরণ আর বুলেটের আঘাত সহ্য করে। রাজপথের লড়াইয়ে বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি দল ও দেশের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি।
১/১১-এর প্রথম নির্যাতন ও রাজপথের সূচনাঃ
মিজানুর রহমান শরীফের ওপর প্রথম রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নির্যাতনের সূচনা হয় ২০০৭ সালের ১/১১-এর বিতর্কিত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তৎকালীন সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলায় তিনি প্রথম দফায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। সেই থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ লড়াইয়ে তিনি প্রতি পদে পদে শাসকগোষ্ঠীর আক্রোশের শিকার হয়েছেন।
হরতাল-অবরোধের পিকেটিং ও পুলিশের গুলিঃ
দেশ ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলনে বিএনপির প্রতিটি হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচিতে ঢাকা শহরের রাজপথে সম্মুখভাগে থেকে পিকেটিং ও মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন মিজানুর রহমান শরীফ। আন্দোলন দমনে পুলিশ বাহিনীর মুহুর্মুহু আক্রমণের মুখে বুক পেতে দিয়েছেন এই ছাত্রনেতা। এমনই এক কর্মসূচিতে পিকেটিং করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন।
আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ এবং ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলাঃ
বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদে দেশব্যাপী যখন ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল, তখন ঢাকার রাজপথে প্রতিবাদী মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন মিজানুর রহমান শরীফ। সেই মিছিল চলাকালীন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ক্যাডাররা লাঠিসোঁটা, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। ফ্যাসিবাদের দোসরদের সেই নৃশংস হামলায় তার হাত ভেঙে যায় এবং মাথায় গুরুতর জখম হন। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে তিনি আবারও ফিরে আসেন প্রিয় রাজপথে।
ময়মনসিংহ সমাবেশ ও শটগানের স্প্লিন্টারে ঝাঁজরা শরীরঃ
২০২১ সালে ময়মনসিংহে ছাত্রদলের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকায় যখন বিক্ষোভ মিছিল বের হয়, তখন পুলিশ বাহিনী মিছিলে অতর্কিত হামলা ও লাঠিচার্জ শুরু করে। একপর্যায়ে রাজপথ থেকেই মিজানুর রহমান শরীফকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরবর্তীতে দেশব্যাপী দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিএনপির কেন্দ্রীয় সমাবেশে তৎকালীন সরকারের পেটুয়া বাহিনী নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে। সেই সমাবেশে সম্মুখভাগে থাকা মিজানুর রহমান শরীফের চোখে ও সারা শরীরে পুলিশের শটগানের অসংখ্য ক্ষতিকারক স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়। শরীরের সেই ক্ষত এবং বুলেটের স্প্লিন্টারগুলো আজও তিনি রাজপথের লড়াইয়ের স্মারক হিসেবে বয়ে বেড়াচ্ছেন।
নয়াপল্টনের ক্র্যাকডাউন এবং ৭ই ডিসেম্বরের সেই কালো রাতঃ
২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে ৭ই ডিসেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশের ইতিহাসের বর্বরতম হামলা, ভাঙচুর ও ক্র্যাকডাউন চালানো হয়। সমাবেশের তিন দিন আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে প্রায় পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে একদিনেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিনও রাজপথে নেতাকর্মীদের আগলে রেখে লড়াই করতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন মিজানুর রহমান শরীফ। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় হন।
২৪-এর ডামি নির্বাচন বর্জন ও জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানঃ
২০২৪ সালের একতরফা ও প্রহসনের ডামি নির্বাচন বর্জনের ডাক দিলে দেশনায়ক তারেক রহমানের নির্দেশনায় ঢাকার প্রতিটি অলিগলিতে দলীয় সব কর্মসূচিতে সফল নেতৃত্ব দিয়ে মিছিল করেন মিজানুর রহমান শরীফ।
সবশেষ চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ও রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে নিজের জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমে আসেন তিনি। আন্দোলনের সবচেয়ে উত্তপ্ত ও বিপজ্জনক সময়গুলোতে—কাকরাইল, যাত্রাবাড়ী এবং শনির আখড়ার মতো ডেথ-জোনগুলোতে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে দিন-রাত অবস্থান গ্রহণ করেন। স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি মাঠ ছাড়েননি এবং খুনি সরকারের পতন ঘটিয়ে রাজপথের চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনেন।
৪২ মামলার রাজনৈতিক প্রতিহিংসাঃ
দীর্ঘ দুই দশকের এই রাজনৈতিক পথচলায় চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন মিজানুর রহমান শরীফ। রাজপথের এই বীর যোদ্ধাকে দমাতে রাজধানীর কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, ওয়ারী, বংশাল এবং পল্টন থানায় মোট ৪২টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দায়ের করা হয়। বছরের পর বছর ধরে এই ৪২টি মামলার হুলিয়া মাথায় নিয়ে, প্রতিনিয়ত আদালতের বারান্দায় হাজিরা দিতে দিতে জীবনের সোনালী সময় পার করলেও আদর্শের প্রশ্নে এক চুলও নড়েননি তিনি।
দল ও দেশের ক্রান্তিলগ্নে জীবন বাজি রাখা সাবেক এই কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা মিজানুর রহমান শরীফ আগামী দিনেও দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাজপথে সক্রিয় থাকতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
