পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’-সংক্রান্ত বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা না করে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সংগঠনটির সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক ডাবলুর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৬ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইজিপির বক্তব্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সংগঠনটির নজরে এসেছে। আইজিপির বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট তুলে ধরতেই এ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন জানায়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রায়ই সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের হামলার মুখোমুখি হতে হয়। ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন আহত হয়েছেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে গত ২৪ অক্টোবর গোপালগঞ্জের বেদগ্রাম খেয়াঘাট এলাকায় একটি মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। ওই ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ছাড়া গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে হাতকড়াসহ এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এতে একজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এসব ঘটনায় পুলিশ সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করে সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। তবে দায়িত্ব পালনকালে বারবার হামলার শিকার হলে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ও মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন আরও জানায়, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৯৬ থেকে ১০৬ ধারা, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১২৭ ও ১২৮ ধারা এবং পুলিশ প্রবিধানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক নির্দেশনা রয়েছে।
আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যায় সংগঠনটি জানায়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুলিশের আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও সক্ষমতা তুলে ধরাই ছিল তার বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য। অপরাধ দমনে পুলিশের দৃঢ় অবস্থান বোঝাতে তিনি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাই বক্তব্যটিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার বক্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা না করে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিষয়ে আইজিপির মন্তব্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। এ ক্ষেত্রে বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। বক্তব্যের বিচ্ছিন্ন অংশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে প্রকৃত বক্তব্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে বলেও মনে করে সংগঠনটি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, পুলিশ ও গণমাধ্যম উভয়ই জনস্বার্থে কাজ করে। পুলিশ অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আর গণমাধ্যম জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়। তাই একে অপরের পেশাগত দায়িত্ব ও বাস্তবতা বোঝার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা জরুরি।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের মতে, পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার ও দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তেমনি আইনের শাসন, মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশের জন্য সব গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
