২০২৬-২০২৯ মেয়াদের নতুন আমদানি নীতি আদেশের খসড়া এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও সমন্বিত করতে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাতে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ দুটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আমদানি নীতি আদেশে যা থাকছে
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানায়, ‘দ্য ইমপোর্টস অ্যান্ড এক্সপোর্টস (কন্ট্রোল) অ্যাক্ট, ১৯৫০’-এর ৩(১) ধারার ক্ষমতাবলে প্রতি তিন বছর পরপর আমদানি নীতি আদেশ প্রণয়ন করা হয়। বর্তমান আদেশের মেয়াদ ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষ হলেও নতুন আমদানি নীতি আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত সেটির কার্যকারিতা বলবৎ রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২০২৯ মেয়াদের নতুন আমদানি নীতি আদেশের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট)-এর পাশাপাশি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির (সেলস কনট্রাক্ট) মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্যিক উভয় খাতের প্রতিষ্ঠানের জন্য মূল্যসীমা নির্বিশেষে পণ্য আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ওপেন অ্যাকাউন্টসহ বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধ পদ্ধতির ব্যবহারের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
এতে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ প্রতিষ্ঠার বিধান সংযোজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও পুনঃরফতানি (রি-এক্সপোর্ট) কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, রফতানি সম্প্রসারণ, আধুনিক সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলা, ব্যবসা সহজীকরণ এবং শিল্প খাতে কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রফতানি বহুমুখীকরণ এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন রফতানিমুখী শিল্প খাতের বিকাশে বিভিন্ন খাতে ‘ফ্রি অব কস্ট’ (এফওসি) ভিত্তিতে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে কোডেক্স স্ট্যান্ডার্ড, ‘ফিট ফর হিউম্যান কনজাম্পশন’, ‘মেলামিন-ফ্রি’ এবং ‘এইচজিপি-ফ্রি’ (হরমোন গ্রোথ প্রোমোট্যান্টস-ফ্রি) সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আমদানি নীতি আদেশে প্রথমবারের মতো ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’র সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের অনুমোদিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্যাপিটাল মেশিনারি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির সুযোগ আরও সহজ করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত আধুনিক অর্থ পরিশোধ পদ্ধতির ব্যবহার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করার উদ্যোগ রাখা হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (টিএফএ)-এর বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমদানি পণ্য দ্রুত খালাস, ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস নিয়ন্ত্রণ, পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট, অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও), ইলেকট্রনিক লাইসেন্স ও পারমিট, অনলাইন সনদ প্রদান এবং ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থার বিধানও সংযোজন করা হয়েছে।
এছাড়া মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত কয়েকটি কীটনাশকের আমদানি নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাণিসম্পদের জেনেটিক উন্নয়ন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং উন্নত প্রজনন প্রযুক্তির বিকাশে সহায়তা দিতে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পূর্বানুমোদনক্রমে গবেষণা কার্যক্রমের জন্য স্পেসিফিক প্যাথোজেন-ফ্রি (এসপিএফ) এবং বোভাইন স্পঞ্জিফর্ম এনসেফালোপ্যাথি (বিএসই)-মুক্ত গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার সিমেন আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ আইনের খসড়াও অনুমোদন
একই বৈঠকে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষ দেশের শীর্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে।
আইনটির মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও সমন্বিত করা। এর আওতায় অনুমোদন, নিবন্ধন, আমদানি-রফতানি, প্রণোদনা, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন এবং সরকারি সেবা আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় করা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানায়, প্রস্তাবিত আইনটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
এছাড়া আইনটি বিনিয়োগ উন্নয়ন কার্যক্রমে বিদ্যমান নীতিগত অসামঞ্জস্যতা কমাবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার কার্যপরিধির দ্বৈততা ও পুনরাবৃত্তি পরিহার, সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারে ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সমন্বিত বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে।
আইনের খসড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলসহ ঘোষিত শিল্পাঞ্চলকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা, লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রদানের পদ্ধতি এবং সময়সীমা নির্ধারণ, ক্ষুদ্র পিপিপি প্রকল্পে সহজ অনুমোদন, অব্যবহৃত সরকারি জমি ও সম্পদ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সুযোগ এবং বিনিয়োগ ও ব্যবসাসংক্রান্ত সব সেবা একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
