ইউক্রেন সংঘাতের ব্যর্থতা ঢাকতে ‘ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ তত্ত্বে জোর রাশিয়ার

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:১১ পিএম

ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থতার মধ্যেই যুদ্ধকে ‘ইউক্রেনের বিরুদ্ধে বিশেষ সামরিক অভিযান’ নয়, বরং ‘ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরার প্রচার জোরদার করেছে রাশিয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘায়িত যুদ্ধ, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ব্যাখ্যা দিতেই ক্রেমলিন এই নতুন বয়ানকে সামনে আনছে।

সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভের এক বৈঠকের ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে গেরাসিমভ দাবি করেন, ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে সফল হতে না পেরে পশ্চিমা মিত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে উদ্যোগ ফিরে পেয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

জবাবে পুতিন পশ্চিমা দেশগুলোর যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ভূমিকা বিশ্লেষণ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই বিশ্লেষণ কাজে লাগতে পারে।

যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার সঙ্গে রুশ দাবির অসঙ্গতি
ভিডিওতে পুতিন দাবি করেন, রুশ বাহিনী পূর্ব ইউক্রেনের কস্তিয়ান্তিনিভকা শহর পুরোপুরি দখল করেছে। তবে ইউক্রেন জানিয়েছে, শহরের একটি অংশ এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এমনকি পুতিনকে সেখানে সাক্ষাৎ করে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বানও জানান।

পুতিন আরও দাবি করেন, চলতি বছরে রাশিয়া ইউক্রেনে তিন হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা দখল করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার- এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাশিয়ার প্রকৃত অগ্রগতি ছিল মাত্র ৯৭ বর্গকিলোমিটার।

প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তে রাশিয়া একটি বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করার চেষ্টা করছে, যেখানে সামরিক সাফল্যের বর্ণনা নিয়ন্ত্রণ করে জনমত প্রভাবিত করা হচ্ছে।

‘বিশেষ অভিযান’ থেকে ‘ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ’
ইউক্রেনের সাবেক উপ-চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেঙ্কোর মতে, ক্রেমলিনের মূল লক্ষ্য রুশ জনগণকে বোঝানো যে, এটি আর শুধু ইউক্রেনের বিরুদ্ধে অভিযান নয়, বরং ন্যাটোর সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ।

তিনি বলেন, ২০২২ সালে কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা বলা ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ এখন পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। এ বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতেই রাশিয়া যুদ্ধকে ন্যাটোর বিরুদ্ধে সংঘাত হিসেবে উপস্থাপন করছে।

তার ভাষায়, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণ এবং ভবিষ্যতে আরও সামরিক তৎপরতা বা নতুন সেনা সমাবেশের প্রয়োজনীয়তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতেই এই প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

নতুন সেনা সমাবেশের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ক্রেমলিন আগামী সেপ্টেম্বরে পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষে আংশিক সেনা সমাবেশ (মোবিলাইজেশন) ঘোষণা করতে পারে।

রোমানেঙ্কো বলেন, নির্বাচনের পর অন্তত আংশিক সেনা সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে এবং সেই লক্ষ্যেই যুদ্ধের বয়ান বদলানো হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া প্রথম ‘আংশিক মোবিলাইজেশন’ ঘোষণা করেছিল। পরে সরকার বড় অঙ্কের আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং অভিবাসীদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার নীতি গ্রহণ করে।

‘যুদ্ধ’ শব্দের ব্যবহার
পুতিনের বক্তব্যের একদিন পর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ প্রকাশ্যে ‘যুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ায় এই সংঘাতকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ ছাড়া অন্য কিছু বলা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ছিল এবং ‘যুদ্ধ’ শব্দ ব্যবহারের অভিযোগে হাজারো মানুষকে জরিমানা, গ্রেফতার ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

পেসকভ বলেন, “এটি এখন সত্যিকারের যুদ্ধ। কারণ কিয়েভের পেছনে বার্লিন, প্যারিস, দ্য হেগ, অসলো এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওয়াশিংটনও রয়েছে।”

প্রচারণার উদ্দেশ্য কী?
কিয়েভভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেনকোর মতে, রাশিয়া যখনই যুদ্ধক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে, কিংবা নিজ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের হামলা বাড়ে, তখনই ক্রেমলিন জনগণের সামনে নতুন ব্যাখ্যা হাজির করে।

তিনি বলেন, “ক্রেমলিন কখনওই স্বীকার করতে চায় না যে, ইউক্রেন সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বরং তারা দেখাতে চায় যে, পুরো পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে। এভাবেই চার বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলার ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।”

ন্যাটোকে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর অভিযোগ
রাশিয়ার অন্যতম প্রচারমূলক অবস্থান হলো- ন্যাটো ধীরে ধীরে ইউক্রেনকে নিজেদের সামরিক কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করছে।

মস্কোর দাবি, ন্যাটো উন্নত প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অস্ত্র সরবরাহ করে ইউক্রেনকে রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিতে হামলার সক্ষমতা দিচ্ছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন ইচ্ছাকৃতভাবে ন্যাটোকে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতে টেনে আনতে চাইছে।

তবে ইউক্রেনীয় সেনাসদস্যরা এসব দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের সাফল্যকে খাটো করে দেখাতেই ক্রেমলিন পুরো সংঘাতকে ‘সমষ্টিগত পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরছে। সূত্র: আল-জাজিরা

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন