ঈদের বাজারেও নেই আগের সেই টুংটাং শব্দ, কামারের দোকানগুলোতে ক্রেতা নেই

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম

আর মাত্র দুই দিন পর মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। প্রতি বছর এই সময় পশু জবাই ও মাংস কাটাকাটিতে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যায়। ছুরি, চাপাতি, দা ও বটির মতো সরঞ্জাম তৈরি ও শান দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কামাররা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টুংটাং শব্দে মুখর থাকে কামারশালা।

তবে এবার ময়মনসিংহের ভালুকার কামারপল্লিগুলোতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরি করে দোকানে সাজিয়ে রাখলেও ক্রেতার দেখা মিলছে খুব কম। এতে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কামাররা।

কামাররা জানান, কোরবানির ঈদকে ঘিরে বছরের এই সময়টিই তাঁদের সবচেয়ে বড় আয়ের মৌসুম। সারা বছর তেমন কাজ না থাকলেও ঈদ সামনে রেখে কয়েক গুণ বেড়ে যেত ব্যস্ততা। কোরবানির ছুরি, চাপাতি ও দা তৈরির মজুরিতেই চলত বছরের অনেকটা সময়ের জীবিকা। কিন্তু এবার বেচাকেনা প্রায় নেই বললেই চলে।

তাঁদের ভাষ্যমতে, বিদেশি ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দেশীয়ভাবে তৈরি সরঞ্জামের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই অনলাইনে এসব পণ্য কিনছেন, যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় কামারদের ব্যবসায়। কয়লার দাম বৃদ্ধি, দোকানভাড়া বেড়ে যাওয়া এবং লোহার মূল্যবৃদ্ধিও তাঁদের সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

একসময় বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এসে কামারদের হাতে তৈরি দা, বটি, ছুরি, কাস্তে, কোদাল ও শাবলসহ বিভিন্ন লৌহযন্ত্র কিনে নিয়ে যেতেন। তখন এই পেশার মানুষদের দিন কাটত ব্যস্ততায়। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই দিন এখন অনেকটাই ফিকে। বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিদেশি ও আধুনিক সরঞ্জাম সহজলভ্য হওয়ায় দেশীয় পণ্যের কদর কমে গেছে।

ভালুকা পৌর এলাকার কামার মনোরঞ্জন চন্দ্র কর্মকার বলেন, তাঁর সংসার চলে এই পেশার আয়ের ওপর নির্ভর করে। ঈদ উপলক্ষে ছুরি, চাপাতি, দা ও বটির মতো বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি করে দোকানে সাজিয়ে রেখেছেন, কিন্তু আশানুরূপ বিক্রি নেই। সারাদিনে দুই-একজন ক্রেতারও দেখা মেলে না।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এই পেশা দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে গেছে। কয়লার সংকট, দোকানভাড়া বৃদ্ধি এবং লোহার দাম বাড়াসহ নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে আমাদের টিকে থাকতে হচ্ছে।’

৫৪ বছর বয়সী নিবারণ চন্দ্র কর্মকার প্রায় ৪০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। পূর্বপুরুষের পেশা হিসেবে এখনও কামারের কাজ ধরে রেখেছেন তিনি। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বিদেশি সরঞ্জামে বাজার সয়লাব হয়ে যাওয়ায় তাঁদের ব্যবসায় বড় ধরনের ভাটা পড়েছে।

নিবারণ চন্দ্র বলেন, ‘একসময় কাজ করে কুল পেতাম না। কোরবানির ঈদের এক মাস আগে থেকেই দিন-রাত কাজ করতে হতো। এখন আমাদের তৈরি লোহার জিনিসপত্রের চাহিদা অনেক কমে গেছে। বেচাবিক্রি কমে যাওয়ায় অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। বাপ-দাদার পেশা বলেই কষ্ট করে এখনও ধরে রেখেছি।’

সিডস্টোর বাজারে প্রায় ১৫ বছর ধরে এ পেশায় নিয়োজিত সুনীন্দ কর্মকারও একই হতাশার কথা জানান। চার সদস্যের পরিবার চলে তাঁর আয়ের টাকায়। দা, বটি ও ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের চাকু তৈরি করে দোকানে সাজিয়ে বসে থাকলেও নেই ক্রেতার আনাগোনা। সারা বছর যেমন টুকটাক কাজ থাকে, কোরবানির ঈদ ঘিরেও এবার তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই। দোকানে চারজন কর্মচারী থাকলেও কাজের চাপ নেই বললেই চলে।

তিনি বলেন, ‘এই কাজ করেই কোনোমতে সংসার চালাই। আগে ঈদের সময় এত কাজ থাকত যে দম ফেলার সময় পেতাম না, এখন সারাদিন বসে থেকেও বিক্রি হয় না।’

ভালুকা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রুবেল মণ্ডল বলেন, ‘একটি প্রকল্পের মাধ্যমে কামারশিল্পকে টিকিয়ে রাখা এবং কামারদের আর্থিক সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শিগগিরই তাঁদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হবে।’

একসময় গ্রামীণ জীবনের অপরিহার্য অংশ ছিল কামারশিল্প। কিন্তু আধুনিকতার চাপে সেই ঐতিহ্যবাহী পেশা আজ টিকে থাকার লড়াইয়ে। যথাযথ সহায়তা না পেলে ভবিষ্যতে এই শিল্প আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন