কারাগার শাস্তির জায়গা নয়, বরং সংশোধনালয়: গাজীপুরের ডিসি

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম

কারাগার কেবল দণ্ড ভোগের স্থান নয়, বরং তা ভুল শুধরে মানুষের সুন্দর জীবনে ফিরে আসার এক সংশোধনকেন্দ্র- এই মানবিক দর্শনকে আবারও বাস্তব রূপ দিলেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।

সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় হাইসিকিউরিটি কারাগার এবং কেন্দ্রীয় কারাগার-২ পরিদর্শনে গিয়ে সাধারণ বন্দিদের সুখ-দুঃখের খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি কারাবন্দি শিল্পী ও বাদকদের প্রতি তার যে সহমর্মিতা ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে, তা এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। 

এদিন প্রথমে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় হাইসিকিউরিটি কারাগার পরিদর্শন করেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। এ সময় তিনি কেবল দাপ্তরিক পরিদর্শনে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি চলে যান কারাগারের রন্ধনশালায়। সেখানে তিনি রান্নার পরিবেশ, রন্ধন প্রক্রিয়া ও বন্দিদের জন্য প্রস্তুত করা খাবারের মান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর কারাগারের হাসপাতালে গিয়ে বন্দিদের চিকিৎসাসেবা সরাসরি তদারকি করেন এবং সেবার মান আরও উন্নত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।

​হাইসিকিউরিটি কারাগার পরিদর্শন শেষে তিনি কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ যান। সেখানে তিনি সাক্ষাৎ করেন গায়ক ও বাদক দলের ১৬ জন বন্দির সঙ্গে। তাদের হাতে তিনি নিজে পাঞ্জাবি ও পায়জামার কাপড়ের সেট উপহার হিসেবে তুলে দেন। এ সময় কারাবন্দি জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মুজিব পরদেশীকেও তিনি পাঞ্জাবি উপহার দেন। বন্দিদের প্রতি এই ভালোবাসার পেছনের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। 

সাংবাদিকদের তিনি জানান, এর আগে আমি একবার কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ পরিদর্শনে এসেছিলাম, তখন ১৫ সদস্যের গায়ক ও বাদক দল আমাকে গান শুনিয়েছিলেন। কারাগারে থেকেও ইতিবাচক মানসিকতাকে ধারণ করে নিজেদের সংশোধন করে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের সুপ্ত বাসনা সেদিন তাদের গানে অনুভব করেছিলাম। তাদের গান মুগ্ধ হয়ে গান শেষে তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম- আপনাদের সবার জন্য একই রকম পাঞ্জাবি-পায়জামার কাপড়ের সেট যদি আমি উপহার দিই, আপনারা কি গ্রহণ করবেন? তারা আনন্দচিত্তে বলেছিলেন, নেবেন। আমি আজ আসার সময় তাদের কাছে আমার দেওয়া সেই প্রতিশ্রুত উপহার পৌঁছে দিয়ে গেলাম। তারা সানন্দ চিত্তে আমার উপহার গ্রহণ করেছেন।’

​পুরো পরিদর্শনজুড়েই জেলা প্রশাসকের মন ছিল বন্দিদের মানবিক সমস্যার দিকে। বিভিন্ন সেলে গিয়ে তিনি সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তাদের পারিবারিক সংকট, আইনি জটিলতা এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত নানা কষ্টের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানে তাৎক্ষণিক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জোরালো আশ্বাস দেন।

​এ সময় সাজা শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ আইনি জটিলতার কারণে কারাগারে আটকে থাকা বিদেশি বন্দিদের বিষয়টিও তার নজরে আসে। তাদের অসহায়ত্ব অনুধাবন করে তিনি অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তির ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।

​একজন অভিভাবক ও সত্যিকারের মানবিক মানুষ হিসেবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার এই উদ্যোগ বন্দিদের মনে নতুন আশার আলো জ্বেলেছে। কারাগারের বন্দি জীবনের মধ্যেও এমন ভালোবাসার ছোঁয়া বন্দিদের মানসিক পরিবর্তনে ও সংশোধনের পথে এক দূরপ্রসারী ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন