চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত ৮৫ শতাংশ শিশুই টিকা নেয়নি

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

চট্টগ্রাম বিভাগে হাম আক্রান্ত ৩০০ শিশুর ওপর পরিচালিত গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। আক্রান্ত শিশুদের ৮৫ দশমিক ২ শতাংশই টিকাবিহীন। তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল।

গবেষণার চূড়ান্ত বিশ্লেষণে মাঝারি ও তীব্র অপুষ্টিকে গুরুতর হাম-জটিলতার সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাধীন ঝুঁকি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে টিকাবিহীন শিশুদের গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আর হাম-পজিটিভ নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে শতভাগ ক্ষেত্রে ‘বি৩’ ধরনের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সম্মেলন কক্ষে গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশ করা হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এআরএফ) এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশু গবেষণা দলের যৌথ উদ্যোগে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে আর্থিক ও সার্বিক সহায়তা করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার।

‘দক্ষিণ বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব: রোগতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, রোগের ধরন, জিনগত বিশ্লেষণ এবং মা ও শিশুর অ্যান্টিবডি পরিস্থিতি’ শীর্ষক গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের বয়স ছিল ২ মাস থেকে ১১ বছর। তাদের ৪৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিশু নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তদের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত এলাকার এবং ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবারের শিশু।

গবেষণায় ১৬৭ শিশু বা ৮৫ দশমিক ২ শতাংশ টিকাবিহীন ছিল। তাদের মধ্যে ৯১ জন তখনো নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছায়নি। টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছেও যারা টিকা নেয়নি, তাদের ৫২ শতাংশের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব বা টিকার তারিখ ভুলে যাওয়াকে কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। এছাড়া ৩০ শতাংশ শিশু অসুস্থ থাকা, ৮ শতাংশ মায়ের অসুস্থতা, ৪ শতাংশ টিকার ভয় এবং ৪ শতাংশ টিকাকার্ড হারিয়ে যাওয়ার কারণে টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

পুষ্টির চিত্রও ছিল উদ্বেগজনক। আক্রান্ত শিশুদের ৩১ শতাংশ বা ৫১ জন তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। গবেষণার চূড়ান্ত বিশ্লেষণে মাঝারি বা তীব্র অপুষ্টিকে গুরুতর হাম-জটিলতার সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাধীন কারণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবেশ ও অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে এমন ঘুপচি ঘরেও গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বেশি পাওয়া গেছে।

ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণেও ঘাটতি পাওয়া গেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া মাত্র ৬৩ শিশু বা ৩২ দশমিক ১ শতাংশ গত ছয় মাসে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ না পাওয়া শিশুদের ৫৯ শতাংশ গুরুতর বা তীব্র জটিলতায় ভুগেছে। এছাড়া ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো হয়নি।

সংক্রমণের উৎস বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতালে যাওয়ার পর হামে আক্রান্ত হয়েছে। বিপরীতে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ শিশুর আগে হাম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণার এ ফল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্ব সামনে এনেছে।

আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জ্বর, ফুসকুড়ি, কাশি, সর্দি ও চোখ ওঠার মতো উপসর্গ ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। জ্বরের গড় স্থায়িত্ব ছিল ৭ দশমিক ৩০ দিন এবং ফুসকুড়ির গড় স্থায়িত্ব ৫ দশমিক ৬৪ দিন।

গবেষণায় মা ও শিশুর অ্যান্টিবডি পরিস্থিতিও বিশ্লেষণ করা হয়। ৯১ জন বা ৯৪ দশমিক ৮ শতাংশ মায়ের হাম-সংক্রান্ত আইজিজি অ্যান্টিবডি পজিটিভ পাওয়া গেছে। ৩৬ জন বা ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ মা আগে হাম টিকা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে মায়ের আইজিজি অবস্থার সঙ্গে গুরুতর রোগ বা নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে পারিসাংখ্যিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

যেসব মায়ের হাম টিকা নেওয়ার ইতিহাস ছিল না, তাদের শিশুদের ৫৫ শতাংশ গুরুতর হাম-জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছে। আর যেসব মায়ের হাম-সংক্রান্ত আইজিজি অ্যান্টিবডি নেগেটিভ ছিল, তাদের ৪০ শতাংশ শিশু গুরুতর জটিলতায় ভুগেছে।

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ফল হলো হাম ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণ। হাম-পজিটিভ নমুনার পূর্ণ জিনগত বিন্যাস বিশ্লেষণে শতভাগ নমুনায় ‘বি৩’ জেনোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় পাওয়া এই জেনোটাইপ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে আগে শনাক্ত হওয়া বি৩ ধরনের ভাইরাসের বিস্তারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণাকালে নতুন করে বিদেশ থেকে সংক্রমণ আসার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই ধরনের জেনোটাইপ আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির পরীক্ষাতেও শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের মধ্যে একজনেরও মৃত্যু হয়নি। বিপরীতে টিকাবিহীন শিশুদের গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসাইন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. তসলিম উদ্দিন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, এতে কোনো শিশুর মৃত্যু হওয়া উচিত নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক শিশু টিকার বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই সময়মতো সঠিক নিয়মে টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি হাম টিকার আওতা ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি করার পাশাপাশি অপুষ্টি দূর করা, প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা এবং হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। গ্রাম, বস্তি, নিম্ন আয়ের পরিবার ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের কথাও বলেন তিনি।

গবেষক দল হাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদানের আওতা ৯৫ শতাংশের বেশি করা, গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক টিকাদান, বাদ পড়া শিশু শনাক্তে বাড়ি বাড়ি কার্যক্রম, টিকার বয়সের আগের শিশুদের দ্রুত শনাক্তকরণ, আলাদা রাখা ও সংস্পর্শ-পরবর্তী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ ও শিশুদের পুষ্টির উন্নয়ন, হাসপাতালে দ্রুত রোগী বাছাই, আলাদা রাখা ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল নিশ্চিত করা এবং হাম নজরদারি, পরীক্ষাগারে রোগ নিশ্চিতকরণ ও দ্রুত রোগ অনুসন্ধান আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতিতে ৬ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়ার সম্ভাবনা এবং ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের হাম-রুবেলা বা হাম-মাম্পস-রুবেলা টিকার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনারও সুপারিশ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড ও এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান গোলাম বাকি মাসুদ।

তিনি বলেন, ‘গবেষণাকে কেবল বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ না রেখে এর উপাত্তগুলোকে বাস্তবভিত্তিক জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে রূপান্তর করতে হবে। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য শুধু তথ্য তৈরি করা নয়, বরং জীবন বাঁচানো।’

গবেষণাটিতে রোগতত্ত্ব, চিকিৎসা, পুষ্টি, মা ও শিশুর অ্যান্টিবডি এবং ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণকে একই গবেষণা কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি সমন্বিত চিত্র পাওয়া গেছে।

গবেষণার ফলাফল বলছে, হাম প্রতিরোধে টিকাদানের পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সবগুলো ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন