চেয়েছি গণতন্ত্র, পেয়েছি মবোক্রেসি

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম

গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেছেন, প্রফেসর ইউনূস কথা দিয়েছিলেন কিন্তু কথা রাখেননি। ৫৪ বছরের ইতিহাসে কেউ কথা রাখেনি। প্রতিটি সরকারের আমলে এত নিপীড়ন, বৈষম্য হয়েছে সমাধান হয়নি। এই সরকারের আমলেও। চেয়েছিলাম গণতন্ত্র, কিন্তু পেয়েছি মবোক্রেসি। এ ধরনের পরিবেশ আগে কখনো দেখিনি। আগামী নির্বাচনে অনেক আশা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হবে কিনা প্রশ্ন রয়ে গেছে। আশা করি সরকার এবং বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করবে। যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, তা যেন পূর্ণ হয়।

বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন: সংখ্যালঘু অধিকার, প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা শীর্ষক একটি গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে তিনি এসব কথা বলেন।

আলোচনায় দেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। অনুষ্ঠানে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব এবং নির্বাচনের ওপর তাদের আস্থা বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।

সিজিএস সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, আমরা নির্বাচন নিয়ে কথা বলছি। এর আগে অনেক নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু তা সঠিক ছিল না। জুলাই আন্দোলনের পর আমরা আশা করছিলাম একটি ভালো নির্বাচন হবে। অনেক ইনক্লুসিভিটি থাকবে কিন্তু তা দেখতে পাচ্ছি না। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিচারে বা ধর্মের বিচারে অনেক বেশি মানুষ এই নির্বাচনের বাইরে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলের অনেকের কাছে সংখ্যালঘুর কথা ভালো লাগে না। কিন্তু আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সংখ্যালঘু। বিএনপি অনেক কষ্ট করে ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এটা বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র। প্রত্যেকের সকল অধিকার আছে ভোট দেওয়ার। সবার সঙ্গে একসাথে কাজ করতে হবে। সংখ্যালঘু নিয়ে কথা বলা এখন বিপজ্জনক। সম্প্রতি ঢাকার বাইরে দেখেছি যে সংখ্যালঘুরা নিজেদের নিরাপদ মনে করে না এবং ভোট দিতে যাওয়া তারা নিরাপদ মনে করে না। সংকটটা হলো গণতন্ত্রের সংকট, আইনের শাসনের সংকট। আদিবাসীদের নিয়ে আমাদের রাষ্ট্র সংবেদনশীল। কিন্তু রাষ্ট্রের উচিত তারা যা চায় তা দেওয়া। এগুলো গণতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলো মানসিক বিষয়। এগুলো নিয়ে আমাদের সবার কাজ করতে হবে। আমরা জানি প্রচুর মানুষ মিথ্যা মামলায় জেলে আছে। এর একটা কারণ হলো, তাদের বড় অংশ যখন কথা বলার দরকার ছিল, তখন তারা কিছু বলেননি। মব নিয়ে কথা হচ্ছে, সরকারের লোক মবকে মব না বলে প্রেসার গ্রুপ বলছে। সরকারকে শিকার করতে হবে কোথায় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ হয়েছে। দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত হলে, তখন আশা করি দেশের সকল সমস্যা সমাধান হবে।

শাহীন আনাম বলেন, আমাদের সরকারের প্রতি যে আস্থা ভেঙে গেছে, তা আমরা গ্রহণ করতে চাই না। সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর এবং মানুষের জীবন পুড়ে ফেলা হয়েছে এবং তার বিচার নিয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই। তাই যারা ভুক্তভোগী, তাদের কোনো বিশ্বাস নেই যে বিচার হবে। আসলে সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতন হচ্ছে, তা আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং আইনগত ব্যবস্থার অভাবের ফল, আর তা হলে এই সমস্যা সমাধান হবে না। তাই মানুষকে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি এবং ভিন্ন মানুষের মতপার্থক্য গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতির প্রতি মানুষের আস্থা নেই। আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কোনো পরিবর্তন আনতে পারিনি। তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিলাম, কিন্তু তা নিশ্চিত করতে পারিনি। উইটনেস ভিকটিম প্রোটেকশন অ্যাক্টের বাস্তবায়ন হয়নি। এগুলোর জন্য আমাদের জোরালো দাবি করতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা দিতে হবে। তা না হলে মানুষের অধিকার বাস্তবায়ন হবে না। সংখ্যালঘুদের আস্থা যেভাবে ভেঙে গেছে, তারা বিশ্বাস করে না যে তারা বিচার পাবে, তাই তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।  

ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও কিছু সংখ্যালঘু গোষ্ঠী রয়েছে এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি তাদের সমস্যাগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা দেখি, রক্ষণশীল পটভূমির নারীরাও এখনও পিছিয়ে আছে। রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে, এমনকি শিশুদেরও লক্ষ্য করা হয়েছে। নির্বাচন সামনে থাকায় নির্বাচন কমিশনকে এসব সহিংসতার বিষয়ে নজর দিতে হবে। হটলাইন ব্যবস্থাও প্রায়ই দূরত্ব বা অন্যান্য কারণে দ্রুত সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়, যা আরও সমস্যা তৈরি করে। এটিকে আরও কার্যকর ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল করতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখা জরুরি। অবশ্যই সংখ্যালঘুদের বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, পাশাপাশি মিথ্যা মামলাগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি করা যায় সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সমস্যাগুলো আরও জটিল হওয়ার আগেই— অর্থাৎ সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পদক্ষেপ নিতে হবে। 

প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া বললেন, আত্মপরিচয়ের সংকট আমরা এখনো সমাধান করতে পারিনি। এই ক্ষেত্রে আমরা খুবই দুর্বল। আমরা এখনো আদিবাসীদের স্বীকৃতি দিতে পারিনি স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর। সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে আমরা একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারি না, কারণ আমরা নিজেরা বিভক্ত হয়ে গেছি। সবার চাওয়া যদি এক না হয়, ব্যথা যদি এক না হয়, তবে অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে? তাই যদি আমরা অধিকার নিয়ে একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ হই, তবে আমরা মানুষের কাছে আস্থাভাজন হব এবং আমাদের সমস্যা সমাধান হবে। আমরা এখনো প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টি করতে পারিনি। কেন আমরা কিছু রাজনৈতিক দলের কাছে বিক্রি হব? দুর্বল মানুষের কাছে বিক্রি হলে আমরা কখনো আমাদের অধিকার আদায় করতে পারব না। তাই যদি আমরা “অধিকারজোট” তৈরি করতে পারি, তবে আমরা আমাদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে পারব। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আবেদন জানাই, আমাদের প্রশ্ন, আমরা কেন তোমাদের ভোট দেব? যদি তারা আমাদের অধিকার নিয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলে এবং তা নিশ্চিত করে, তবেই আমরা তাদের ভোট দেব। 

ব‍্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এখানে যারা কথা বলছেন, তাদের কথা অনেক সময় শুধু শোনা হয়, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয় না। যদি হত, তবে ২০২৬ সালে এসে এসব বিষয় নিয়ে এখন আর আলোচনা হত না। এই ব্যর্থতা শুধু এখনকার নয়, এটা দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল। আমাদের সংবিধানে যে অধিকার রয়েছে, তা এখনো সবার জন্য নিশ্চিত হয়নি। প্রতিটি জাতিগত মানুষের ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে কি না, তাদের নিরাপত্তা আছে কি না, তা নিয়ে সমানভাবে কাজ করতে হবে। আসন্ন নির্বাচনে, বিএনপি এবং জামায়াত ইসলাম যে এলাকার নির্বাচন করছে, তারা সংখ্যালঘুদের নিয়ে বলেন, তারা যদি আমাদের ভোট দেয়, তবে আমরা জিতব, কিন্তু তারা তাদের প্রতিনিধিত্ব রাখে না এবং পরে তাদের স্বীকৃতি দেয় না। ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু একটি বড় দল অংশগ্রহণ করতে পারছে না, তাই আগামী নির্বাচন সৎ ও গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদি জনগণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং তাদের প্রতিনিধি জয়ী করতে পারে, তবে আমরা বলতে পারব যে এটি একটি সুস্থ নির্বাচন হয়েছে।

ভিক্ষু সুনন্দ প্রিয় বলেন, অতীতে আট দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে এবং বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য অব্যাহত রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে আমরা ভেবেছিলাম এটি হয়তো একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করবে, কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। সংখ্যালঘুরা এখনও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। যদি নিজের দেশেই ন্যায়বিচার না পাওয়া যায়, তবে আমরা আর কোথায় যাব?

নিকোলাস চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আমি একজন আদিবাসী হিসেবে বলতে চাই, আমরা আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগি। পার্বত্য চুক্তিতে উপজাতি এবং সংবিধানে ক্ষুদ্রনৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ রয়েছে। তাই আত্মপরিচয়ের সংকট দূর করা উচিত। বর্তমানে সংখ্যালঘুদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মতো পরিবেশ নেই। নতুন সরকারের কাছে দেশবাসীর অনেক আশা রয়েছে। আর যদি পার্লামেন্টে সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ না থাকে, তবে আমাদের অধিকার এবং আমাদের কষ্ট সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝবে? তাই আমরা সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্তি চাই। 

ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, আমাদের শক্তিশালী রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাব রয়েছে, যা সম্ভবত সমাজে ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিস্তারের একটি বড় কারণ। যারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নয়, তারা প্রায়ই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, ফলে বিভাজন আরও বাড়ে। আজ যারা ভোট চাইছে, তারাই অনেক ক্ষেত্রে রক্তের দাগ বহন করছে— এ কথা মানুষ ভুলে যাবে না। তারা হয়তো নির্বাচনে জিততে পারে, কিন্তু মানুষের আস্থা আর কখনো পুরোপুরি ফিরে পাবে না। তাছাড়া আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় ভূমি আইন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাও নেই। এমন পরিস্থিতিতে এই দেশ থেকে কীভাবে আমরা কোনো অর্থবহ অগ্রগতি বা ন্যায়বিচার আশা করতে পারি?

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ সভাপতি জিল্লুর রহমান। অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, ঢাকা মহানগর পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার, বাংলাদেশ দলিত পরিষদের বিভাগীয় প্রধান চন্দ্রমোহন রবিদাস; প্রথম আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক পার্থ শংকর সাহা, বাংলাদেশের ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলনের মুখ হো চি মিন ইসলাম; সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান প্রমুখ। 

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর