ভদ্রা, ঢাকী আর শিবসা এতদিন বিছিন্ন করে রেখেছিল দক্ষিণ জনপদের সুতারখালী ও কামারখোলার ১৮টি গ্রাম। দীর্ঘ নৌপথের যাত্রার প্রয়োজন ফুরিয়ে সেই ভদ্রা নদীর বুকে নির্মিত হলো গার্ডার সেতু। নদীবেষ্টিত খুলনার দাকোপ উপজেলার শিংজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কালিনগর বাজারসংলগ্ন ভদ্রা নদীর ওপর নির্মিত এ সেতুতে ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি ৭৫ লাখ ৯ হাজার ২৩৭ টাকা।
খেয়া পারাপারের দীর্ঘ অপেক্ষা আর ঝড়-বৃষ্টির ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা দূর করে মানুষের যাতায়াত ও কৃষিপণ্য সহজ এবং নিরাপদে পৌঁছে যাবে গন্তব্যে। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন না হলেও সেতুটির ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। এতে ভদ্রা নদীর দুপাড়ের সাত ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে বইছে আনন্দের জোয়ার। সেতুটির কারণে অন্য জেলার সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন সুদৃঢ় হবে। কৃষি, শিল্প ও পর্যটন খাতে সাধিত হবে ব্যাপক উন্নয়ন। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন দুয়ার খুলবে। শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে জনজীবনে আনবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আর কৃষি অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জানায়, অল্প সময়ের মধ্যেই সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে পারে। প্রতিদিন বিকেলে সেতুটি দেখতে শত শত মানুষ ভিড় করছেন। সেতু চালু হওয়ায় দাকোপ উপজেলা সদর ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে সাত ইউনিয়নের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। একই সঙ্গে পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলা থেকে মোংলা বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগও সহজ হবে। এতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ভৌগোলিক কারণে দাকোপ উপজেলা ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডার নামে পরিচিত তিনটি পৃথক দ্বীপ নিয়ে গঠিত। ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান বাধা ছিল ভদ্রা নদী। এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যেতে খেয়া বা ট্রলারই ছিল একমাত্র ভরসা। এ কারণে সেতু নির্মাণের দাবিতে স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছিলেন। সেতুর পশ্চিম পাশে ৩২ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়ন। পূর্ব পাশে ৩৩ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে দাকোপ, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ, বাজুয়া ও বানীশান্তা ইউনিয়ন।
এলজিইডির ‘গুরুত্বপূর্ণ ৯টি সেতু নির্মাণ ও প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজ’ প্রকল্পের আওতায় কালিনগর জিসি-খুটাখালী জিসি সড়কের শূন্য চেইনেজে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে নির্মিত সেতুটির বর্ধিতাংশসহ দৈর্ঘ্য ৬৬১ দশমিক ৬৮৫ মিটার এবং প্রস্থ ৭ দশমিক ৩ মিটার। সংযোগ সড়ক বা ভায়াডাক্টের দৈর্ঘ্য ১৪০ দশমিক ১৬ মিটার।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পিটিএসইএল মৈত্রী (প্রা.) লিমিটেড ২০১৬ সালের ১৫ আগষ্ট সেতুর কাজ শুরু করে ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় কার্যাদেশ বাতিল হয়।
পরে ২০১৯-২০ অর্থবছরে দ্বিতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হলেও তারাও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি। এরপর তৃতীয় দফায় ঢাকার এমবিইএল-এইসি-কেই (জেভি) কাজের দায়িত্ব পায়।
কালিনগর বাজারের ব্যবসায়ী সোহরাফ সানা বলেন, ব্রীজ না থাকলে কৃষকদের ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হতো। তারা নামমাত্র মূল্যে পণ্য কিনে নিত। শাকসবজি, ফলমূল, দুধ এবং মাছের মতো পচনশীল পণ্য দ্রুত বাজারে না পৌঁছালে নষ্ট হয়ে যেত। সেতুটি চালু হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন করে আশাবাদী।
গ্রাম্য চিকিৎসক হরিপদ হালদার বলেন, খেয়া পারাপারের কারণে মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত উপজেলা বা জেলা সদরে নেওয়া কঠিন ছিল। এখন সড়কপথে দ্রুত রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হবে।
খুলনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল ইসলাম সরদার কালবেলাকে বলেন, সেতুটি চালু হওয়ায় ওই অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। কৃষি ও বিপণনব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে।
তিনি আরও বলেন, সেতুর ফলে শিল্প ও পর্যটন খাতে সাধিত হবে ব্যাপক উন্নয়ন। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে আসবে আমূল পরিবর্তন।
