জমকালো ক্যানভাস, মলিন তারুণ্যঃ উচ্চশিক্ষার আঙিনায় নীরব মনস্তাত্ত্বিক সংকট

সাব এডিটর (সম্পাদকীয়)
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম

আমাদের চেনা সামাজিক বাস্তবতায় একটা অলিখিত নিয়ম দাঁড়িয়ে গেছে সন্তান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছে কিংবা নামী কোনো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে মানেই যেন জীবনের সব বৈতরণী পার হয়ে গেছে। ক্যাম্পাস জীবনের রঙিন দিনগুলো, বন্ধুদের সাথে চায়ের আড্ডায় তুমুল তর্ক আর লাইব্রেরির ব্যস্ততা উচ্চশিক্ষার আঙিনা বলতে আমাদের মধ্যবিত্ত চোখ সাধারণত এই ছবিগুলোই দেখতে ভালোবাসে। আমরা অবলীলায় ধরে নিই, এই তরুণেরা জীবনের সবচেয়ে সেরা ও নিশ্চিন্ত সময়টা পার করছেন। কিন্তু এই জমকালো ক্যানভাসের আড়ালে যে কতটা একাকীত্ব, চাপা হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস জমে পাথর হয়ে আছে, তার খবর কি আমরা আসলেই রাখি? আমাদের এই যৌথ অন্ধত্বকে এক বড় ধাক্কা দিয়েছে সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা। চৌধুরী ও তাঁর সহকর্মীদের ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে আমাদের আগামী প্রজন্মের মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষতের এক বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত রূপচিত্র।

পরিসংখ্যানের চোখে বিপন্ন আগামী

গবেষণার পরিসংখ্যানগুলো এক দেখায় আঁতকে ওঠার মতো। তথ্য বলছে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৪.২ শতাংশই কোনো না কোনো মাত্রার বিষণ্ণতায় ভুগছেন। এর চেয়েও বিপজ্জনক সত্য হলো, প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর একজন (২৫.৮%) ক্যাম্পাসে আসার পর কোনো না কোনো পর্যায়ে নিজের জীবনটা থামিয়ে দেওয়ার কথা, অর্থাৎ আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার কথা ভেবেছেন! আমরা সমাজ কিংবা পরিবার থেকে খুব সহজেই বলে দিই, “এই বয়সে ক্যারিয়ার নিয়ে একটু-আধটু মন খারাপ বা মানসিক চাপ তো সবারই থাকে।” কিন্তু এই গবেষণা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে, এটা স্রেফ সাময়িক মন খারাপ নয়। তরুণদের এই গভীর মানসিক সংকটের পেছনে কেবল পড়াশোনার চাপ বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা দায়ী নয়; আমাদের ভঙ্গুর সামাজিক অবক্ষয়, হল বা মেসের দমবন্ধ করা আবাসন সংকট, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এর পেছনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

অথচ এই তরুণদের অনেকেই বাঁচতে চান, একটুখানি বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো স্বস্তি চান। ২২.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী তীব্রভাবে অনুভব করছেন যে তাদের মানসিক চিকিৎসা বা পেশাদার কাউন্সেলিং দরকার, কিন্তু তারা সেই সুযোগটুকু পাচ্ছেন না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি আসলেই শিক্ষার্থীদের মনের কথা শোনার মতো কোনো সংবেদনশীল কান বা সহমর্মিতার পরিবেশ আছে? নাকি আমাদের সমাজ এখনো মানসিক স্বাস্থ্যকে ‘বিলাসিতা’ কিংবা ‘পাগলামি’র তকমা দিয়ে ড্রয়ারে বন্দি করে রাখছে?

শারীরিক অবহেলা ও আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা

সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের পাশাপাশি চলছে শরীরটাকে তিলে তিলে শেষ করার এক অদ্ভুত আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা। সিজিপিএ আর ভালো চাকরির পেছনে অন্ধের মতো ছুটতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা ভুলে গেছেন যে এই শরীরটা সুস্থ না থাকলে ডিগ্রি কোনো কাজে আসবে না। ৫৫.২ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত সকালের নাস্তাই করেন না। প্রতি চারজনে একজন শিক্ষার্থী দিনে তিন বেলা ঠিকমতো খাবার মুখে তোলার সময় পান না। এমনকি ৪৩.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম দুই লিটার পানিও পান করছেন না। যে বয়সে শরীর ও মন সবচেয়ে সতেজ থাকার কথা, সেই বয়সে পুষ্টিহীনতা আর তীব্র অনিয়মকে তারা নিজেদের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছেন।

ডিজিটাল স্ক্রিনের নীল মায়া

এর সাথে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল স্ক্রিনের এক ভয়ংকর আসক্তি। অর্ধেকেরও বেশি (৫৪.৫%) তরুণ দিনে ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাটাচ্ছেন। ঘুম থেকে ওঠার মাত্র ৩০ মিনিটের মাঝেই ফোন চেক করেন ৮৭.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী, যার মধ্যে ৫৪ শতাংশেরই চোখ খোলার সাথে সাথে প্রথম কাজ হলো নীল আলো ছড়ানো স্ক্রিনে বুঁদ হওয়া। এই ভার্চুয়াল জগৎ তাদের এক কাল্পনিক রঙিন দুনিয়া দেখাচ্ছে, যা দিনশেষে তাদের বাস্তব জীবনকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ ও একাকী করে তুলছে। ফলে স্বাভাবিক ঘুম হারিয়ে গেছে। ২২.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না, আর এক দল অতিরিক্ত ঘুমিয়ে নিজেদের ভেতরের বিষণ্ণতা আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করছেন।

শখ ও সৃজনশীলতার বিলুপ্তি

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের চেনা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের ভেতরের মানুষটিকে দিনে দিনে মুষড়ে ফেলছে, কেড়ে নিচ্ছে তাদের সমস্ত সৃজনশীলতা। মাত্র ২৬.৩ শতাংশ তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর নিজের লালিত শখের চর্চা ধরে রাখতে পেরেছেন। সিংহভাগ শিক্ষার্থীই (৬৩.৫%) জানিয়েছেন, তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সময়ের অভাবে তারা শখের চর্চা করতে পারছেন না। আর ১০.২ শতাংশের জীবন থেকে ‘শখ’ শব্দটাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পড়াশোনার চাপ আর নোটের জাঁতাকল এতটাই যে, ২৯.১ শতাংশ শিক্ষার্থী দিনে গড়ে এক ঘণ্টাও নিজের আগ্রহ থেকে আলাদা করে কোনো বই পড়তে বসতে পারছেন না।

ভয়ের ছায়ায় ঘেরা ক্যাম্পাস

এর উপর রয়েছে এক চরম নিরাপত্তাহীনতা। ৩৫.১ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করেন না। যে ক্যাম্পাস হওয়ার কথা ছিল মুক্তচিন্তা, নির্ভয়ে হেঁটে বেড়ানো আর বড় হওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সেখানেও তরুণেরা এক ধরনের সংশয় আর সূক্ষ্ম ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। গবেষণার রিগ্রেশন মডেল আমাদের স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেয় যে, ক্যাম্পাসের এই নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শিক্ষার্থীদের মনের বিষণ্ণতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অদৃশ্য কারাগার ভাঙার সময় এখনই

দিনশেষে এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু কিছু সংখ্যা নয়, বরং আমাদের ভেঙে পড়া সমাজ ব্যবস্থার এক একটি সতর্কসংকেত। আমরা কি তবে সিজিপিএ আর করপোরেট বাজারের ইঁদুরদৌড়ে জেতানোর জন্য আমাদের সন্তানদের অনুভূতিহীন এক একটি রোবট বানিয়ে তুলছি? তাদের স্বাভাবিক বিকাশ, মানসিক প্রশান্তি এবং আনন্দের চারণভূমিগুলো আমরা নিজ হাতে সংকুচিত করে দিয়ে এখন তরুণদের সহনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি। এখনই সময় এই অদৃশ্য কারাগারের দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলার। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু নামেমাত্র কাউন্সেলিং সেন্টার নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি উন্মুক্ত এবং বন্ধুত্বের জায়গা তৈরি করতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং মুক্তচর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এখন আর কোনো সুযোগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা। আসুন, সার্টিফিকেটের চেয়ে আমরা আমাদের সন্তানদের বেঁচে থাকার আনন্দকে মূল্য দিতে শিখি। অন্যথায়, জিপিএ-ফাইভ আর বড় ডিগ্রির উজ্জ্বল আলোতেও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক গভীর, নীরব ও অন্ধকার অতলে হারিয়ে যাবে, যা কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের পক্ষেই আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

গবেষণা সূত্রঃ
Chowdhury, J. N. H., Bhuiya, M. A.-I., Morium, M., Riya, I. J., Rafi, M. S. H., Akter, A., Chowdhury, N. H., Akter, S., Monira, & Morshed, M. U. (2026). “Socio-demographic Predictors of Depression among University Students in Bangladesh: Evidence from regression Modeling”. Unpublished Manuscript, BONDHU.

লেখকবৃন্দঃ
জান্নাতুন নূর হায়দার চৌধুরী, মো: আল-ইমরান ভূঁইয়া, মারজিয়া মরিয়ম, ইসরাত জাহান রিয়া, মো: সাকাওয়াত হোসেন রাফি, আরজু আক্তার, নুবায়রা হোসেন চৌধুরী, সাবরিনা আক্তার, মনিরা (গবেষণা সহকারী, বন্ধু) এবং মাহাদী-উল-মোর্শেদ (প্রধান গবেষক, বন্ধু এবং সেন্টার ফর ইন মাল্টিডিসিপ্লিন – সিআরএম)।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর