জিন্নাতের হাত ধরে বাংলাদেশের প্রথম পদক

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৬ এএম

সাড়ে ৫টায় কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে লোকাল ট্রেনে নাগোয়া স্টেশন পৌঁছানো। সেখান থেকে শাটল বাসে ছুটে যাওয়া প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরের করগি অ্যাথলেটিক পার্কে। উদ্দেশ্য নারী ক্রিকেটে পদকের সাক্ষী হওয়া। বাংলাদেশ পারেনি, হেরেছে পাকিস্তানের কাছে। দ্রুতই ছুটে চলা প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরের তকই সিটিজেন জিমনেশিয়ামে। এখানে পদকের স্বপ্ন ধাক্কা খেল জাপানের কাছে হারে। আরেকটি ব্যর্থ দিনের সন্ধ্যার আঁধার নামার পর উশু থেকে এলো জিন্নাত আক্তারের হাত ধরে প্রথম পদক জয়ের খবর।

আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে এটিই বাংলাদেশের প্রথম পদক। এই ‘প্রথম’ ঘুচিয়ে দিয়েছে বক্সার মোশাররফ হোসেনের একাকিত্ব। ১৯৮৬ সালে সিউল অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী ৪০ বছর ছিলেন এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের একমাত্র ব্যক্তিগত পদকজয়ী ক্রীড়াবিদ। নেপালের প্রতিপক্ষকে ৩৮ সেকেন্ডে নকআউট করে পদক জিতেছিলেন মোশাররফ হোসেন। নারীদের ৫২ কেজি ফাইট ইভেন্টে জিন্নাত আক্তারের এ পদক এসেছে অভিনব কায়দায়। প্রাথমিক রাউন্ডে বাই পান বাংলাদেশের প্রতিনিধি, নাম লেখান কোয়ার্টার ফাইনালে। শেষ আটের লড়াইয়ে নামার আগে অফিসিয়াল ওজন পরিমাপে ধরা পড়ল ইন্দোনেশিয়ার থারিসা দিয়া ফ্লোরেন্তিনার দেহের নির্ধারিত ওজনের চেয়ে বেশি। উশুর নিয়মানুযায়ী এই অবস্থায় প্রতিযোগী ইভেন্টে অংশগ্রহণ করার অযোগ্য ঘোষিত হন। ঘোষিত হলেন জিন্নাত আক্তারের প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ও। কোনো ম্যাচ না খেলেই অন্তত ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত হলো জিন্নাতের। সেটা স্বর্ণ কিংবা রুপায় পরিণত করার সুযোগ থাকছে সেমিফাইনাল ম্যাচের ওপর। সেমিতে বাংলাদেশের এ প্রতিনিধির প্রতিপক্ষ চীনের ইউ ডি। উশু হচ্ছে মার্শাল আর্টের চায়নিজ সংস্করণ। হাজার বছর আগে চীনে জন্ম নেওয়া এই খেলায় দেশটির প্রতিনিধিরা বেশ দক্ষ। তাই জিন্নাতের সামনে চ্যালেঞ্জটাও বড়।

তারপরও ম্যাটে নামার আগেই হার মানতে নারাজ নেত্রকোনা থেকে উঠে আসা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই ক্রীড়াবিদ, ‘আমি নিজের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করব। কোয়ার্টার ফাইনালেও আত্মবিশ্বাসী হয়ে নেমেছিলাম। কিন্তু খেলাই তো হলো না।’ এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে পদক জয়ের পর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে যেন কণ্ঠ আটকে আসছিল, ‘আমি আসলে ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। খুবই ভালো লাগছে।’

উশুর বিভিন্ন ইভেন্টে ব্রোঞ্জ পদকের ভিন্নতা থাকে। তাই জিন্নাত আক্তারের অন্তত ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করার বিষয় নিয়েও শুরুতে ছিল ধূম্রজাল। সেটা দূর করেছেন বাংলাদেশ উশু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক দিলদার হাসান দিলু, ‘ইভেন্টে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড় সংখ্যার ওপর নির্ভর করে—ব্রোঞ্জ পদক একটা না দুইটা হবে। সাধারণত ইভেন্টে প্রতিযোগীর সংখ্যা ৮ কিংবা কম হলে ব্রোঞ্জ পদক একটাই প্রদান করা হয়। কিন্তু নারীদের ৫২ কেজি ফাইট ইভেন্টে প্রতিযোগীর সংখ্যা ছিল ৮-এর বেশি। যার অর্থ দুটি ব্রোঞ্জ থাকছে এই ইভেন্টে। জিন্নাত যেহেতু সেমিফাইনালে নাম লেখাল, তাই অন্তত ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত হয়েছে।’

জিন্নাত আক্তারের ব্রোঞ্জ পদক জয়ের খবরটা নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) সহসভাপতি ও এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের শেফ দ্য মিশন মেজর (অব.) ইমরোজ আহমেদ। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত গেমসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে অবশ্য পদকের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। ইমরোজ আহমেদ বাংলাদেশ উশু অ্যাসোসিয়েশনের বরাত দিয়ে পদকের বিষয়টি নিশ্চিত করলেন।

গেমসের আগে সম্ভাবনাময় হিসেবে ক্রিকেট, কাবাডির পর আরচারি ও শুটিংয়ের নাম উচ্চারিত হয়েছে। উশু ঘিরে সেই অর্থে প্রত্যাশা ছিল না। শেষ পর্যন্ত খেলা থেকেই এলো মান বাঁচানোর পদক। বাকি ইভেন্টগুলো থেকে আদৌ অর্জনের সম্ভাবনা আছে কি না বলা কঠিন। তাই আপাতত মুখরক্ষা উশু দিয়েই। ২০১০ সালের ঢাকা এসএ গেমসের আগে খেলার সরঞ্জাম আমদানির জটিলতায় ইভেন্ট আয়োজন নিয়েই ছিল অনিশ্চয়তা। শেষ পর্যন্ত সেই আসর থেকে দুটি স্বর্ণপদক জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার আরও বড় মঞ্চে পদক জিতে ফের শিরোনামে উশু। কাকতালীয়ভাবে দুই ক্ষেত্রেই সাধারণ সম্পাদকের ভূমিকায় ছিলেন দিলদার হাসান দিলু।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন