চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সেপ্টেম্বরেই ভয়াবহ গতি পেয়েছে। বছরের প্রথম আট মাসে যে সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছিল, সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনেই তার বড় একটি অংশ যুক্ত হয়েছে। সংক্রমণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মৃত্যুও। সরকারি হিসাবে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৮ জন। তাদের মধ্যে পাঁচজনই শিশু। আক্রান্ত ৩ হাজার ৯২২ জনের মধ্যে শিশু ৮৭২ জন।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দৈনিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৯২২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১২৭ জন। চলতি বছরে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৩১ জন। মোট আক্রান্তের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৯৪৫, নারী ১ হাজার ১০৫ এবং শিশু ৮৭২ জন। মৃতদের মধ্যে নারী ৯, পুরুষ ৪ ও শিশু ৫ জন।
সেপ্টেম্বরেই সংক্রমণের সর্বোচ্চ চাপ দেখা গেছে। মাসের ২৪ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৮৮৬ জন, মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। এর আগে জানুয়ারিতে ৬৮, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭, জুনে ১২২, জুলাইয়ে ৫৩৬ এবং আগস্টে ১ হাজার ২০২ জন আক্রান্ত হন। জুলাইয়ে মৃত্যু হয় দুজনের, আগস্টে আরও দুজনের। ফলে আগস্টের পুরো মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনেই রোগী বেড়েছে ৬৮৪ জন।
দীর্ঘমেয়াদি হিসাবেও চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতির পরিবর্তন স্পষ্ট। ২০২০ সালে আক্রান্ত ছিলেন ১৭ জন, মৃত্যু শূন্য। ২০২১ সালে আক্রান্ত ২৭১, মৃত্যু ৫। ২০২২ সালে আক্রান্ত ৫ হাজার ৪৪৫, মৃত্যু ৪১। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৮৭, মৃত্যু ১০৭। ২০২৪ সালে আক্রান্ত ৪ হাজার ৩২৩, মৃত্যু ৪৫ এবং ২০২৫ সালে আক্রান্ত ৪ হাজার ৮৬৪, মৃত্যু ২৭।
চলতি বছরের আক্রান্তদের মধ্যে মহানগরে ১ হাজার ৭৭০, উপজেলাগুলোতে ১ হাজার ৭১১ এবং অন্যান্য জেলা থেকে চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ৪৪১ জন। উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত সীতাকুণ্ডে ৫১২ জন। এরপর কর্ণফুলী ২৪৩, রাঙ্গুনিয়া ১৩১, বাঁশখালী ১২৩, সাতকানিয়া ৯৪, আনোয়ারা ৯১, রাউজান ৮২ ও পটিয়া ৮০ জন।
সংখ্যার এই হিসাবের পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের একেকটি গল্প। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুতে একের পর এক নিভেছে শিশুর জীবন। ৮ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের তিন বছর বয়সী সিফাত মারা যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর একই হাসপাতালে মৃত্যু হয় আট বছর বয়সী আবরারের। যে বয়সে স্কুল, খেলনা আর স্বপ্ন নিয়ে বড় হওয়ার কথা, সেই বয়সেই থেমে যায় তাদের জীবন।
১০ সেপ্টেম্বর মারা যান স্বাস্থ্য সহকারী রাশেদা বেগম রিমা (২৯)। দ্বিতীয় সন্তান জন্মের মাত্র এক মাস ছয় দিনের মাথায় ডেঙ্গু কেড়ে নেয় তাকে। ঘরে পড়ে থাকে সাড়ে চার বছরের সন্তান আর মায়ের বুকের দুধের ওপর নির্ভরশীল মাত্র এক মাস ছয় দিনের শিশু। মায়ের চলে যাওয়া তাই শুধু একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানো নয় দুই শিশুর জীবন থেকেও হারিয়ে যায় সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
১১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা অর্পিতা দাশ (২৬)। ৬ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেমে যায় মায়ের জীবন। এরপর মৃত অবস্থায় প্রসব হয় তার গর্ভের সন্তান। সম্ভাব্য জন্মতারিখ ছিল ১২ অক্টোবর। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই শেষ হয়ে যায় শিশুটির জীবন; পূর্ণ হওয়ার আগেই ভেঙে পড়ে একটি পরিবারের অপেক্ষা।
১৭ সেপ্টেম্বর চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যায় পাঁচ বছর বয়সী সিরাজুল মুনিরা। মাত্র দুই দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর মৃত্যু হয় প্রথম শ্রেণির সাত বছর বয়সী শিক্ষার্থী অনুশ্রী দাশের। জ্বরের পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে প্রথমে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাকে। অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে। শেষ পর্যন্ত সেখানেই থেমে যায় শিশুটির জীবন।
অনুশ্রীর চলে যাওয়ার পর ঘরে পড়ে থাকে তার বই-খাতা, ছবি আর ছোট ছোট স্মৃতি। ২ আগস্ট যে শিশুর জন্মদিন ঘিরে পরিবারের আনন্দ ছিল, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধেই সেই ঘর নেমে আসে শূন্যতায়। বাবার কাছে সন্তানের ছবি তখন আর কোনো উৎসবের স্মৃতি নয়; হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া একটি জীবনের শেষ চিহ্ন।
২৪ সেপ্টেম্বরের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত ১৮ জনের মধ্যে পাঁচজন শিশু। আক্রান্তদের প্রায় ২২ শতাংশ শিশু। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৩১ রোগীর মধ্যে ২৪ জন শিশু। অর্থাৎ সংক্রমণের পরিসংখ্যানেও শিশুদের উপস্থিতি এখন আলাদা করে চোখে পড়ছে।
শুধু রোগীর সংখ্যা নয়, হাসপাতালের ভেতরের চিত্রও সংকটের মাত্রা জানান দিচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ইউনিটে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ বাড়ার নজির রয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ৪০ শয্যার ডেঙ্গু ইউনিটে ৭১ রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। অতিরিক্ত রোগীদের কেউ কেউ ওয়ার্ডের মেঝেতেও চিকিৎসা নিয়েছেন।
হাসপাতালের একটি বিছানায় ডেঙ্গু রোগী, পাশে স্বজনের নির্ঘুম রাত। কোথাও মশারি টাঙানো, কোথাও রোগীর পাশে বসে আছেন বাবা-মা কিংবা স্বজন। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেও মশার উৎপাত থেকে পুরোপুরি মুক্তি মিলছে না এমন বাস্তবতা রোগী ও স্বজনদের উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে। ডেঙ্গু চিকিৎসার পাশাপাশি হাসপাতালের ভেতর-বাইরের মশক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতাও তাই রোগী সুরক্ষার অংশ হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের ডেঙ্গু সংক্রমণ আবার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। জেলার ২০টি এলাকাকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে চলতি বছরে প্রায় ২ হাজার ২৪০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। ১৮ মৃত্যুর মধ্যে ১২ জনও এসব এলাকার বাসিন্দা। সীতাকুণ্ডের পাশাপাশি নগরের হালিশহর, বন্দর, পাহাড়তলী, বাকলিয়া, কোতোয়ালি, সদরঘাট, পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন এলাকা ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডে পরিচালিত জরিপেও এডিসের প্রজনন পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে লার্ভা পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় লার্ভার উপস্থিতি প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। অর্থাৎ হাসপাতালের বিছানায় রোগী বাড়ার পেছনে শহরের আবাসিক এলাকা, নির্মাণাধীন ভবন, ছোট নালা ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কর্মসূচিও কম হয়নি। ৩ সেপ্টেম্বর থেকে নগরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মশকনিধন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকায় প্রজননস্থল ধ্বংস, ফগিং, লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ১২ সেপ্টেম্বর শুরু হয় তিন মাসের ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’। এর আওতায় প্রায় ২ হাজার মসজিদ ও মসজিদ প্রাঙ্গণ এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ‘সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তার কার্যালয়ের হিসাবে সেপ্টেম্বরের শেষ অথবা অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণের প্রবণতা থাকতে পারে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ওয়ার্ড হিসেবে রাখা হয়েছে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পাঁচটি করে শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসা বাড়ালেই হবে না, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। বাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে মশকনিধন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চলছে। সকালে লার্ভিসাইড এবং বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে। শুধু মশা নিধন নয়, এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস এবং নগরবাসীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি। সাম্প্রতিক এক সেমিনারেও তিনি মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে গবেষণা ও স্বাস্থ্য বিভাগ, নগর কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় ও জনগণের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।’
কিন্তু এত কর্মসূচির পরও মৃত্যু থামছে না। পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে, ফগার চলছে, লার্ভিসাইড ছিটানো হচ্ছে, সচেতনতার লিফলেট বিতরণ হচ্ছে। তারপরও কোনো একটি বাড়ির জমে থাকা পানিতে জন্ম নেওয়া মশা পৌঁছে যাচ্ছে আরেকটি বাড়িতে, সেখানে জ্বর নিয়ে শুয়ে পড়ছে শিশু, মা কিংবা পরিবারের উপার্জনক্ষম কেউ। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু সিটি করপোরেশনের ফগার কিংবা হাসপাতালের চিকিৎসকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল বলেন, ‘প্রতিবছর একই পদ্ধতিতে রাসায়নিক প্রয়োগ করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে। কোন কীটনাশকের বিরুদ্ধে এডিসের প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে, কোন রাসায়নিক কার্যকর এবং কোন এলাকায় কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে এসব বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন।’
তার পর্যবেক্ষণ, বড় প্রবহমান নালার তুলনায় ছোট ও বদ্ধ নালায় এডিসের লার্ভা বেশি পাওয়া যেতে পারে। তাই বড় নালার পাশাপাশি ভবন ও আবাসিক এলাকার আশপাশের ছোট নালা পরিষ্কার ও সচল রাখা জরুরি। ভবন মালিক, বাসিন্দা ও স্থানীয় কমিটিকে যুক্ত না করলে শুধু সরকারি অভিযান দিয়ে স্থায়ী ফল পাওয়া কঠিন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ২৫০টি উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করে ১৯টি উদ্ভিদের নির্যাসে মশার লার্ভা নিধনে শতভাগ কার্যকারিতা পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। গবেষণাটি প্রাথমিক পর্যায়ে হলেও পরিবেশবান্ধব মশকনিধন পদ্ধতি তৈরিতে এর সম্ভাবনা রয়েছে।
