দখল-দূষণে হাড়িধোয়ার করুণ দশা, হারিয়ে যাচ্ছে নদীর প্রাণ

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

একসময় নরসিংদীর তিনটি উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া হাড়িধোয়া নদীটির যৌবন ছিল দেখার মতো। এই নদী দিয়ে পাল তোলা নৌকা আর বড় বড় কার্গো জাহাজ এসে ভিড়ত নরসিংদী বড় বাজারে। মাঝিমাল্লাদের হাঁকডাক, পাইকারদের কোলাহল আর নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের আশীর্বাদে এই জনপদ হয়ে উঠেছিল মুখরিত। 

নরসিংদীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যে মুকুট, তার অন্যতম প্রধান মণি ছিল এই হাড়িধোয়া নদী। কিন্তু আজ সেই আশীর্বাদের নদী নিজেই এখন ধুঁকে ধুঁকে মরছে। দখল, দূষণ আর নাব্য সংকটের ত্রিমুখী আক্রমণে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ হাড়িধোয়া এখন এক মৃতপ্রায় নালায় পরিণত হয়েছে। নদীর দিকে তাকালে এখন আর রুপালি জলের দেখা মেলে না। এখন তাকালে দু’চোখে পড়ে শুধু আলকাতরার মত রং ও পানি। প্লাস্টিকের স্তূপ আর দুপাশের অবৈধ দখলের দেয়াল নদীটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। দেখে চেনার উপায় নেই যে, এটি কোনো নদী, নাকি ময়লা ফেলার কোনো বড় ভাগাড়।

হাড়িধোয়ার এই অকাল মৃত্যুর পেছনে সবচেয়ে বড় দায় নদীর দুপাড়ে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত শিল্প কারখানাগুলো। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য প্রতিটি কারখানায় ইটিপি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও, বাস্তবে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক কারখানায় ইটিপি প্ল্যান্টই নেই। তবে যেসব কারখানায় ইটিপি প্ল্যান্ট রয়েছে এর মধ্যে হাতে গুনা কয়েকটি কারখানা বাদে প্রায় সবায়ই ইটিপি প্ল্যান্ট ব্যবহার করছে না। বলা চলে লোক দেখানো বা মোবাইল কোর্ট থেকে বাঁচার জন্য বসিয়ে রাখা হয়েছে ইটিপি প্ল্যান্টগুলো।

প্রশাসনের পরিদর্শনের সময় এগুলো চালু করা হলেও, দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা অপরিশোধিত বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি গিয়ে মিশছে নদীর বুকে। ফলে নদীর পানি এখন কুচকুচে কালো আর দুর্গন্ধময়, যাতে কোনো জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার উপায় নেই। পুরো নদীর বুকে একটি মাছও নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। 

নরসিংদী বড় বাজারসহ আশেপাশের পুরো অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য একসময় গড়ে উঠেছিল এই নদীকে কেন্দ্র করেই। সস্তায় পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল হাড়িধোয়ার জলপথ। কিন্তু নাব্য সংকটের কারণে শুকনা মৌসুমে নদী শুকিয়ে খাঁ খাঁ চর আর কোথাও পচা কাদা ও প্লাস্টিকের আস্তরণ পড়ে থাকে। ফলে বন্ধ নৌপথের বাণিজ্য। এক সময় যে নদী জীবিকার জোগান দিত, আজ তার চারপাশের মানুষ ভুগছেন চর্মরোগসহ নানা মরণব্যাধীতে। যেন দেখার কেউ নেই।

শনিবার তিনটি উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদী পাড় দিয়ে ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষার পানি আসায় নদীতে পানি দেখা গেলেও দুর্গন্ধে নদী পাড় দিয়ে হাঁটা মুশকিল। এছাড়াও পনি দেখতে কালু কুচকুচে। বেশিরভাগ এলাকায়ই নদীর দু’পাড় বয়লা-আবর্জনের স্তূপ পড়ে রয়েছে। নদীতে কচুরিপানা ও বিভিন্ন প্লাস্টিকের বর্জ্য পড়ে রয়েছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে সরাসরি পাইপ লাইন দিয়ে নদীতে পানি ফেলা হচ্ছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, ‘এ পানিতে নামা যায় না, তবে কোনো কারণে এই নদীতে কেউ নামলে শরীরে খুচপাচরার মত রোগ দেখা দেয়।’

নরসিংদী পানি উন্নয়ন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি শিবপুর উপজেলার অলিপুরা বাজার থেকে শুরু হয়ে পলাশ উপজেলা হয়ে নরসিংদী সদর উপজেলার নরসিংদী বড় বাজার পুরাতন থানার ঘাট দিয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়। হাড়িধোয়া নদী পূনঃখনন, নদীর তীর সংরক্ষণ ও নদীর তীরের ল্যান্ডস্কেপিং-এর মাধ্যমে পরিবেশের উন্নয়ন করার জন্য সাড়ে ৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে এবং শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৭ সালের জুন মাসে। 

পুটিয়া বাজার এলাকার নদী তীরের বাসিন্দা আলমাছ মিয়া বলেন, ‘যে পরিমাণ দূষণ আর দখল হচ্ছে, এমনভাবে চলতে থাকলে আর বেশিদিন লাগবে না এই নদীর অস্তিত্ব বিলন হতে। আমরা একসময় এই নদীতে গোসল করতাম, আমাদের মা-দাদিরা এ নদীর পানি দিয়ে রান্না করতো এবং নদী থেকে মাছ ধরে আমরা খেতাম। আর এখন এ নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকাই যায়না দুর্গন্ধের কারণে। কেউ নদীতে নামলে সাথে সাথেই খুচপাচরার মত নানা রোগ দেখা দেয় শরীরে।’

নরসিংদী বড় বাজারের ব্যবসায়ী তৌসিফ আহমেদ বলেন, ‘সংগ্রামের পর থেকে এই বাজারে ব্যবসা করে আসছি। ওই সময় এ নদী দিয়ে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ মালামাল নিয়ে বাজারে আসতো, পাশাপাশি ক্রেতারাও এ নদী পথ দিয়েই নৌকাযোগে এসে যার যা প্রয়োজন ক্রয় করে আবার নদী পথেই চলে যেতো। এখন সে কথা শুধু কল্পনা। কারণ দুর্জন ও নদীর নাব্যতা হারানোর কারণে এ নদীর বুক দিয়ে নৌকায় করে মালামাল পরিবহন করা একে বাইরে অসম্ভব।’

ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর দুই তীরে থাকা ডাইং, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন কারখানাগুলো প্রতিদিন কোনো প্রকার পরিশোধন ছাড়াই রাসায়নিক বর্জ্য ফেলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাজার ও বাসাবাড়ির ময়লা পানি। ফলে নদীর পানি কালচে হয়ে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে নদী পাড়ের মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’

সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর নরসিংদীর সাধারণ সম্পাদক হলধর দাস বলেন, ‘একটি নদী মারা যাওয়া মানে একটি সভ্যতার অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার ইঙ্গিত বহন করা। কারণ, এমনিতেই সারাবিশ্বে এআই-এর ব্যবহারে বিপুল পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি আমরা হারাচ্ছি। তাই, চারদিকে দৃশ্যমান দূষিত পানির রাজ্যে নরসিংদীর প্রাণ হাড়িধোয়া নদীকে বাঁচাতে হলে এখনই ‘লোক দেখানো’ ইটিপির নাটক বন্ধ করতে হবে এবং দখলদারদের হাত থেকে নদীকে মুক্ত করতে হবে। অন্যথায়, মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে নরসিংদীর এই ঐতিহাসিক আশীর্বাদের সামান্য অস্তিত্বটুকুও।’

নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. বদরুল হুদা বলেন, ‘হাড়িধোয়া নদীর পাশে ১৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি বাদে সবগুলোতেই ইটিপি প্লান্ট রয়েছে। হাজীপুর ড্রাইং নামে যে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ম মানেনি এবং তাকে বার বার সতর্ক করার পরও তিনি ইপিটি প্লান্ট করেননি তাই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধুমাত্র যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বারা নদীটি দূষণের শিকার হচ্ছে তা কিন্তু নয়, মানুষের যে মল-ময়লা আছে, তার প্রায় সবগুলোই হাড়িধোয়া নদীতে ফেলা হয়। যার কারণে নদী দূষণের মাত্রা আরো বেড়ে গেছে। এছাড়াও শিল্প প্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত কোনো বর্জ্য যাতে নদীতে ফেলতে না পারে সে ব্যাপারে পরিবেশন অধিদপ্তর নজরদারি রাখছে।’

নরসিংদী পানি উন্নয়ন বিভাগ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় হাড়িধোয়া নদী পুনঃখনন, নদীর তীর সংরক্ষণ ও নদীর তীরের ল্যান্ডস্কেপিং-এর মাধ্যমে পরিবেশের উন্নয়নমূলক একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত পনেরো ভাগ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। নদীর পানি কমতে শুরু করলে বা কী কাজ শুরু হবে এবং সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হবে।’

নরসিংদী জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, ‘সবাইকে সঙ্গে নিয়েই পরিবেশ ও নদী রক্ষায় জেলায় কাজ করে যাচ্ছি। নদী দূষণের ব্যাপারে আমরা শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সাথে নিয়মিত সভা করছি, যাতে ওনারা ইটিপি প্লান্ট এর মাধ্যমে বর্জ্য সংশোধন করে পানি নদীতে ফেলেন। এছাড়াও নিয়মিত মনিটরিং কারা হচ্ছে যাতে সব সময় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইটিপি প্লান্ট চালু রাখা হয়।’

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন