নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার আলালপুর গ্রামের একটি পুকুরে ‘জলপরী’ দেখা গেছে, এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক দিন ধরে সেখানে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে এই গুজবের শুরু। পরে স্থানীয় প্রশাসন পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরার পর জানিয়েছে, সেখানে জলপরী নয়, মাছের ঝাঁকই দেখা গিয়েছিল।
পুকুরটি ব্যক্তিমালিকানাধীন। মালিক কবির আহমেদ ভূঁইয়া সেখানে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া ও সিলভার কার্পসহ বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ করেন। তিনি ঢাকায় থাকেন। পুকুরে অস্বাভাবিক কিছু দেখা গেছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি গ্রামে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা চান।
মনোহরদীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, চার থেকে পাঁচ দিন আগে স্থানীয় এক কনটেন্ট নির্মাতা ফেসবুকে পুকুরে কিছু একটা সাঁতার কাটার ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে পানির প্রায় ওপরের দিকে কালো অবয়বের কিছু একটা চলতে দেখা যায়। এরপরই সেটিকে ‘জলপরী’ বলে প্রচার শুরু হয়।
গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষও পুকুরের কাছে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। স্থানীয় কিছু মানুষ পুকুর ঘিরে পূজা ও অর্চনাও শুরু করেন।
পরে পুলিশ ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে পুরো পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘পুকুরে মাছ ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যায়নি। মাছের ঝাঁক একসঙ্গে চলাচল করার সময় পানির ওপর থেকে বা পাশ থেকে সেটিকে বড় কোনো প্রাণীর নড়াচড়া বলে মনে হতে পারে।’
তিনি বলেন, ওই মাছের ঝাঁকের একসঙ্গে চলাচল একদিনই দেখা গিয়েছিল। সেটির ভিডিও করে কেউ কেউ কৃত্রিম প্রযুক্তির সহায়তায় গুজব ছড়িয়েছেন বলেও জানান ইউএনও।
গুজব ঠেকাতে পুলিশকে নিয়মিত পুকুরটির আশপাশে নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কনটেন্ট নির্মাতাদের শুধু ভিউ পাওয়ার জন্য এ ধরনের গুজব না ছড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে একজন কনটেন্ট নির্মাতার কাছ থেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে।
জলপরী মিথ কোথা থেকে এলো?
জলপরী নিয়ে মানুষের আগ্রহ কেবল নরসিংদীর এই ঘটনা ঘিরেই নয়। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে হাজার হাজার বছর ধরে জলপরী বা মৎস্যকন্যাকে ঘিরে নানা পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। কোথাও তারা সৌভাগ্যের প্রতীক, আবার কোথাও অমঙ্গল ও বিপদের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
ইংরেজি ‘মারমেইড’ শব্দটি মূলত সমুদ্র ও তরুণী বোঝানো দুটি শব্দের সমন্বয়ে তৈরি। প্রচলিত কল্পনায় মারমেইডের শরীরের ওপরের অংশ মানুষের মতো এবং নিচের অংশ মাছের লেজের মতো। পুরুষ চরিত্রও রয়েছে, যাদের মারম্যান বলা হয়।
বিভিন্ন লোককথায় জলপরীদের দীর্ঘ জীবন, গান গাওয়ার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ দেখার মতো অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। আবার নাবিকদের অনেক গল্পে তাদের ঝড়, জাহাজডুবি ও বিপদের পূর্বাভাস হিসেবেও দেখানো হয়েছে।
জলপরীর ধারণার সুনির্দিষ্ট উৎপত্তি কোথায় বা কখন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে বিভিন্ন সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন ও লোককথায় জলজ মানবসদৃশ চরিত্রের উপস্থিতি পাওয়া যায়। রয়েল মিউজিয়ামস গ্রিনউইচের তথ্য অনুযায়ী, মেসোপটেমীয় সভ্যতায় পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এক পুরুষ মৎস্যদেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় এক হাজার বছর আগে সিরিয়ায় আতারগাতিস নামের এক দেবীকে ঘিরেও জলপরীর মতো একটি কাহিনী প্রচলিত ছিল।
পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলপরীর কাহিনী ভিন্ন ভিন্ন নামে ছড়িয়ে পড়ে। আফ্রিকায় ‘মামি ওয়াটা’, স্লাভিক সংস্কৃতিতে ‘রুসালকি’, আয়ারল্যান্ডে ‘মেরোজ’ এবং স্কটল্যান্ডে ‘সেলকি’ নামে জলজ অতিপ্রাকৃত চরিত্রের গল্প রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘সুবর্ণমচ্ছা’ নামের জলপরীর কাহিনিও প্রচলিত।
গ্রিক পৌরাণিক কাহিনীর ‘সাইরেন’ চরিত্রের সঙ্গেও পরবর্তীতে মৎস্যকন্যার ধারণা যুক্ত হয়। হোমারের ‘ওডিসি’তে সাইরেনদের নাবিকদের প্রলুব্ধ করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও প্রাচীন বর্ণনায় তাদের পাখির মতো শরীর ছিল, পরবর্তী সময়ে তাদের মাছের লেজযুক্ত নারীরূপে চিত্রিত করা হয়।
সাহিত্য ও চলচ্চিত্রেও জলপরীর উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। ডেনিশ লেখক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেনের ‘দ্য লিটল মারমেইড’ রূপকথাটি ১৮৩৭ সালে প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে গল্পটি থিয়েটার, অপেরাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৮৯ সালে ডিজনির অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রে এটি নতুন করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
