জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নির্যাতিতদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি) এবং মায়ের ডাক-এর যৌথ উদ্যোগে ২৬ জুন ২০২৬ রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (কেআইবি)-এ “প্রতিকার ও পুনর্বাসনের অধিকার বিষয়ক জাতীয় সংলাপ” অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে গুম, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তি, তাদের পরিবারের সদস্য, জুলাই আন্দোলনে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, সংসদ সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন অংশীজন অংশগ্রহণ করেন।
সংলাপে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতিকার, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের অধিকার নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় ভুক্তভোগী সনদ, সরকারি ও বিরোধী দলের সমান প্রতিনিধিত্বে একটি মানবাধিকার বিষয়ক সংসদীয় কমিটি এবং নির্যাতন প্রতিরোধে একটি স্বাধীন জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা (National Preventive Mechanism–NPM) প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মাননীয় সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, দীর্ঘ বছর ধরে গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিতের আহ্বান জানান এবং আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকার তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
এরপর কানাডার University of Regina-এর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ “নির্যাতনের পর জীবনকে সমর্থন” শীর্ষক অবস্থানপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার, প্রতিকার ও পুনর্বাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে তিনটি নীতিগত প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবাধিকার বিষয়ক সংসদীয় কমিটি প্রতিষ্ঠার আহ্বান, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত থাকবে; একটি জাতীয় ভুক্তভোগী সনদ গ্রহণ; এবং OPCAT ও Paris Principles-এর আলোকে স্বাধীন মানবাধিকার তদারকি ব্যবস্থা ও জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা (NPM) শক্তিশালী করা।
সংলাপের অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তি, গুমের শিকার পরিবারের সদস্য এবং জুলাই আন্দোলনে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা সত্য উদ্ঘাটন, বিচার, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, অনেক পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের কোনো খোঁজ না পেয়ে অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। ভবিষ্যতে যেন আর কাউকে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়, সে জন্য তারা দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
আলোচনায় মাননীয় সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন, মাননীয় সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান, মাননীয় সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা এবং ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম গুম, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কার্যকর তদন্ত, ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক (victim-centred) বিচার, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি গুমের শিকার পরিবার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের সংগ্রামের অংশ হিসেবে নিজেকে অনুভব করেন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী নূর খান লিটন বলেন, বিচার প্রক্রিয়াকে অবশ্যই ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক হতে হবে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও মনোসামাজিক ক্ষতি এবং মর্যাদা পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। তিনি গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে ভবিষ্যতে পরিচয় শনাক্তকরণে কোনো জটিলতা না থাকে। পাশাপাশি তিনি কথিত গোপন আটককেন্দ্রসমূহ (secret detention facilities) চিহ্নিত করে সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের সভাপতি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “এখন আর শুধু কান্নার সময় নয়, এখন ন্যায়বিচার পাওয়ার সময়, অধিকার আদায়ের সময়।” তিনি গুম ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে ধারাবাহিক আইনগত তদারকি নিশ্চিত করতে মানবাধিকার কমিশন গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করতে চায়। গুম একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং এর বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের মতো গুমের শিকার পরিবারগুলোর জন্যও ভাতা ও প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। মানবিক প্রশ্নে এ বিষয়ে কোনো দলীয় বিভাজন নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি)-এর মহাসচিব মো. মাহবুল হক সংলাপে উত্থাপিত দাবিসমূহ এবং অবস্থানপত্রে প্রস্তাবিত জাতীয় ভুক্তভোগী সনদ, মানবাধিকার বিষয়ক সংসদীয় কমিটি এবং জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা (NPM) প্রতিষ্ঠাসহ অন্যান্য সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে মায়ের ডাক-এর হাজেরা খাতুন ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি সংলাপে অংশগ্রহণকারী সকল অতিথি, বক্তা, গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, তাদের পরিবারের সদস্য এবং অংশীজনদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অংশগ্রহণকারী হিসেবে গবেষক ও পলিসি অ্যানালিস্ট মাহাদী-উল-মোর্শেদ বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবার এবং গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তির পরিবারকে সরকার থেকে অতি দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান করা দরকার। এই আয়োজন করার জন্য তিনি এইচআরডিসি এবং মায়ের ডাক পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি) এবং মায়ের ডাক আশা প্রকাশ করে যে, এই জাতীয় সংলাপ নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতিকার, পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা আরও সুদৃঢ় করতে সহায়ক হবে।
