ভবন আছে দুটি। দ্বিতল বিশিষ্ট ভবন দুটির একটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। অপর ভবনটিতে পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান চলছে পরিত্যক্ত ভবনেও। ভবনটির বিভিন্ন অংশে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে খসে পড়ছে দেয়াল ও ছাদের আস্তরণ। দেখা যাচ্ছে ছাদের রডও। ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ছে। এতোসব সমস্যা ও ঝুঁকি নিয়ে সাত শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা উচ্চ বিদ্যালয়ে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৮ সালে চরম্বা ইউনিয়নে দুই একর ২৩ শতক জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় মাধ্যমিক এই বিদ্যালয়টি। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। পরিত্যক্ত ঘোষিত দ্বিতল ভবনটি পেয়েছিল সরকারের ফ্যাসিলিটি প্রকল্পের আওতাধীন ১৯৯৫ সালে, যার নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৯৭ সালে। সাত শতক জায়গার ওপর নির্মিত ভবনটিতে কক্ষ আছে ছয়টি। ভবনটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক চলতি বছরের ২৮ জুন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। দুটি দ্বিতল বিশিষ্ট ভবনের অপরটি নির্মিত হয় বিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে, যার নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৫ সালে।
নতুন ভবনেও কক্ষের সংখ্যা ছয়টি। নিরুপায় হয়ে পরিত্যক্ত ঘোষিত সেই ছয় কক্ষ বিশিষ্ট দ্বিতল ভবনেই চলছে শ্রেণি কার্যক্রম।
রোববার (৪ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পরিত্যক্ত সেই ভবনটির দেয়ালের রং উঠে গেছে বহু আগেই। দোতলায় মাঝখানে কক্ষটির ছাদ বিম ভেঙে ভয়ানক অবস্থা। নিচে পড়ে আছে ভাঙা ছাদের সিমেন্ট-কংক্রিটের আস্তরণের ভাঙা টুকরো। তার পাশের কক্ষেই ক্লাস নিতে দেখা যায় দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের। সেই কক্ষটিরও ছাদ ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, দেখা যাচ্ছে রডও। নিচতলায় দুটি কক্ষে প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকদের অফিস। অপর কক্ষটিতে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলছিল। বিদ্যালয়ের মাঠও অরক্ষিত। ফলে মাঠের মাটি সরে গিয়ে উঁচুনিচু হয়ে আছে।
শিক্ষার্থীরা জানায়, চরম্বা ইউনিয়নের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এবং পড়াশোনার মান ভালো হওয়ার সুবাদে তিন চার কিলোমিটার দূর থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে এসে ভর্তি হয়। কিন্তু বর্তমানে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তা তাদের জন্য আতঙ্কের।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুবাইতা ফাইরুজ সামিন কালবেলাকে বলে, আমরা একটা পরিত্যক্ত ভবনে ক্লাস করি। এতে যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, যা মাইলস্টোনের ট্র্যাজেডিকেও হয়তো হার মানাবে। এজন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, যেন একটি নতুন ভবন উপহার দিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী শাহানা ইয়াসমিন বলে, গত এক বছর ধরে আমাদের বিদ্যালয়টি অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্লাস চলাকালীন পুরোটা সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকে।
অভিভাবক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমার একমাত্র ছেলে অত্র বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। আমি অভিভাবক হিসেবে সার্বক্ষণিক চিন্তিত থাকি কখন না আবার অঘটন ঘটে বসে। ভবনটি যেহেতু পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে সুতরাং ওটা ভেঙে নতুন একটি ভবন নির্মাণ করা জরুরি।
আরেক অভিভাবক কুবরাতুল ঝুমুর। যিনি একইসঙ্গে পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তিনি বলেন, বিদ্যালয়টির একটি ভবন জুন মাসে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এখনো ওই পরিত্যক্ত ভবনে ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করার কারণে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় মন বসাতে পারছে না। তারা সারাক্ষণ আতঙ্কের উপর থাকে। ফলে স্বাভাবিক পড়াশোনার ধারা তা ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষকরা জানান, স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে প্রয়োজন ২৪টি কক্ষ। এখন ছয়টি কক্ষেই চালাতে হচ্ছে শ্রেণি কার্যক্রম। উপকরণ মজুত থাকলেও কক্ষের অভাবে চালু নেই গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, কম্পিউটার ল্যাব, কমনরুম ও প্রার্থনা ঘর।
চরম্বা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পবন কান্তি দত্ত কালবেলাকে বলেন, বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার গত ২৫ জুন জেলা শিক্ষা প্রকৌশন অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামের নেতৃত্বে সহকারী প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলীরা বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনটি পরিদর্শন করেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২৮ জুন ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে শ্রেণি কক্ষ সংকটের কারণে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করতে অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে। বাধ্য হয়ে পরিত্যক্ত ভবনে ক্লাস চালিয়ে নিতে হচ্ছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্প পথ নেই।
তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, গুরুত্ব বিবেচনায় অতি শিগগিরই চরম্বা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম অভ্যাহত রাখার স্বার্থে একটি নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা দরকার।
চরম্বা উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি শফিকুল আলম লিটন কালবেলাকে বলেন, ১৯৬৮ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে চরম্বার শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বহু শিক্ষার্থী আজ সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে মোট ২৪টি শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন হলেও রয়েছে মাত্র ছয়টি শ্রেণিকক্ষ। এর ফলে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদ্যালয়টি নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষার উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সরকারের নিকট আমাদের সবিনয় আবেদন- চরম্বা উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান শ্রেণিকক্ষ সংকটের বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
