সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান।
তিনি বলেন, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেই পর্যটনের উন্নয়ন করতে হবে। পর্যটন বন্ধ করার কথা বলা হচ্ছে না তবে পর্যটনের নামে প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত স্থানীয় পর্যায়ের অংশীজনদের অবহিতকরণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যেতে তিনি এ কথা বলেন।
মশিউর রহমান বলেন, সিলেট জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় একটি অঞ্চল। হাওর, পাহাড়, টিলা, চা-বাগান, নদীসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে এ অঞ্চলে। এসব সম্পদকে কেন্দ্র করে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উন্নয়ন করতে গিয়ে যেন প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।
তিনি বলেন, সিলেটের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হবে, কিন্তু তা হতে হবে প্রকৃতিবান্ধব ও টেকসই। পর্যটনের নামে প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি করা যাবে না।
পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয় কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের নয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, কৃষি, মৎস্য, সড়ক, অবকাঠামো, শিল্প, নগরায়ণ, পর্যটন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ প্রতিটি খাতের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের উদাহরণ তুলে ধরে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরের যে প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করত, অতিরিক্ত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কারণে সেখানে পরিবর্তন এসেছে। এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সিলেটসহ অন্যান্য পর্যটন এলাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে। পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু সভা-সেমিনার করে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব নয়। পরিবেশ রক্ষায় মানুষের ব্যক্তিগত আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। কর্মশালায় উপস্থাপিত জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অগ্রগতি সম্ভব হবে।
কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের অংশীজনদের কাছ থেকে পাওয়া মতামত জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পরবর্তী ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় অংশীজনদের মতামত নেওয়াই এ কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য। কর্মশালায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অংশীজনদের কাছ থেকে পাওয়া মতামত ও সুপারিশ পরবর্তী প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হবে। পরে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে। এরপর এসব বিষয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে।
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংরক্ষিত এলাকার কার্যকর ব্যবস্থাপনা, প্রজাতি ও প্রতিবেশব্যবস্থার বেসলাইন মূল্যায়ন এবং অঞ্চলভিত্তিক বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্ব দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। একই সঙ্গে দূষণ ও প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ, শিল্পবর্জ্য পরিশোধন এবং ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশের ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন প্রয়োজন, তবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব যেন সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি পরিবেশ সংরক্ষণে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করে বলেন, সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে তরুণেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার, সিলেটের বিভাগীয় পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ, পরিচালক মোহাম্মদ হাসান হাছিবুর রহমান ও এ কে এম রফিকুল ইসলাম, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পাপিয়া সুলতানা, সাংবাদিক আফতাব চৌধুরী।
কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা, বিভিন্ন বিম্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা।
