জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তরুণদের তামাক ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তর একত্র করে প্রতি ১০ শলাকা প্যাকেটের সর্বনিম্ন মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা। একই সঙ্গে সব স্তরে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাক কর বৃদ্ধি: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাংবাদিকদের করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় এ দাবি জানানো হয়।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাফিউন নাহিন শিমুল। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের কর্মসূচি পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি—৩৫.৩ শতাংশ (গ্যাটস ২০১৭)। তামাকজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। ২০২৪ সালে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা—যা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব (প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা)-এর দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশের বর্তমান বহুস্তরবিশিষ্ট তামাক কর কাঠামো জটিল এবং তা তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে কার্যকর নয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট সহজলভ্য থাকায় তরুণদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। তাই আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিম্ন ও মধ্যম স্তর একত্র করে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ২০০ টাকা নির্ধারণ এবং সব স্তরে প্যাকেটপ্রতি ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
অধ্যাপক সাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, বর্তমান বহুস্তরবিশিষ্ট তামাক কর কাঠামো তামাক নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট সহজলভ্য থাকায় ব্যবহারকারীরা সহজেই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে সরে গিয়ে ধূমপান অব্যাহত রাখছেন। এই দুটি স্তর একত্র করে দাম বাড়ানো হলে তামাক ব্যবহার কমবে, ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণের ধূমপান শুরু করার প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকরা বলেন, তামাক কর বৃদ্ধির মতো জনস্বাস্থ্যবান্ধব নীতি বাস্তবায়নে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে বাজেট প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক কর বৃদ্ধির ইস্যুকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গণমাধ্যমকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের কর্মসূচি পরিচালক শেখ মোমেনা মনি বলেন, সরকার টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনায় তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত লক্ষ্য অর্জনে বদ্ধপরিকর। এসব লক্ষ্য অর্জনে তামাকপণ্যে কর বৃদ্ধি একটি ব্যয়-সাশ্রয়ী ও কার্যকর পদক্ষেপ। তাই সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশে তামাক ব্যবহার কমাতে তামাকপণ্যে কার্যকরভাবে করারোপ ও মূল্য বৃদ্ধি করা হবে।
সমাপনী বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, তামাকপণ্যে কর বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও টেকসই অর্থায়নের জন্য একটি কার্যকর নীতি। এটি শুধু রাজস্ব বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ক্ষতি থেকে রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। প্রস্তাবিত কর সংস্কার বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় বেড়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে, যা আগের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বেশি।
কর্মশালায় ‘তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার: অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি’ বিষয়ক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সমন্বয়ক ডা. অরুনা সরকার। কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতিক এজাজ। এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
