বিলুপ্তির পথে পারকি সৈকতের ঝাউবন। কয়েকবছর আগেও যেখানে হাজার হাজার ঝাউগাছ দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে আজ নামমাত্রে কিছু গাছের অস্তিত্ব দেখা যায়। উপকূলীয় বনবিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়হীনতা, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে বিলুপ্তির পথে ঝাউগাছ। এদিকে পলি আর কাদা জমে যাওয়ায় বিপাকে পড়ছে সৈকতে আগত পর্যটকরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সৈকতের সৌন্দর্যবর্ধক ঝাউগাছগুলো বিলুপ্তির পথে, যে কয়টি দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোর গোড়ার মাটি সরে গেছে। বর্তমানে পুরো ঝাউবাগান হুমকিতে আছে। ঝাউবাগানের আকার অনেক ছোট হয়ে গেছে। বন বিভাগের তদারকি না থাকা, সৈকতের চর থেকে বালু উত্তোলনসহ নানা অব্যবস্থাপনার কারণে সৈকতের এই বেহাল দশা।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ১৯৯৩-১৯৯৪ সালে আর্কিটেকচার পদ্ধতিতে প্রায় ২৩ হাজার ঝাউগাছ রোপণ করা হলেও বিগত দুই যুগে একটি চারাও রোপণ করেনি বনবিভাগ। বৃক্ষখেকোদের কবলে পড়ে অর্ধেকে নেমে এসেছে ঝাউগাছের সংখ্যা। কর্ণফুলী টানেল, প্রধান সমুদ্র বন্দর ও বঙ্গোপসাগরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে পারকি সৈকতে প্রতিদিন অর্ধ লক্ষাধিক পর্যটক আসা-যাওয়া করে। ছুটির দিনে এ সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায়। পর্যটন করপোরেশনের ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পর্যটক কমপ্লেক্সের কাজও শেষের পথে, কিন্তু সৈকতে কাদা আর ঝাউগাছ নিধন দেখে হতাশা প্রকাশ করেন পর্যটকরা।
জানা গেছে, উপকূল রক্ষায় ১৯৯৩-৯৪ সালে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পারকি সমুদ্র সৈকতে আর্কিটেকচার পদ্ধতিতে প্রায় ২৩ হাজার ঝাউগাছ রোপণ করে বন বিভাগ। ঝাউগাছগুলো বড় হয়ে সৈকতের বালুচরে শোভাবর্ধন করে। সারি সারি ঝাউগাছ পারকি সৌকতকে অপরূপ করে। ধীরে ধীরে এই সৈকত দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে। ২০০২ সালে আরেকটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৮০ হেক্টর জায়গায় ঝাউগাছ রোপণ করা হয়। গাছগুলো বড় হওয়ার পর পর্যটকের পদচারণা বাড়তে থাকে। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লে পারকিকে পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। এরপর থেকে পারকি সমুদ্র সৈকত দেশের পর্যটন শিল্পে প্রসার লাভ করতে থাকে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনা ও বঙ্গোপসাগরের বালু চরে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সারি সারি ঝাউগাছগুলো হয়ে উঠে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সৈকত এলাকা থেকে বালি উত্তোলন, ঘূর্ণিঝড়, আটকে পড়া ক্রিস্টাল গোল্ড জাহাজের প্রভাব, বন খেকোদের বদ নজর ও বন বিভাগের উদাসীনতায় হাজার হাজার ঝাউগাছ হারিয়ে গেলেও গত ২৪ বছরে এ অঞ্চলে একটি গাছও রোপণ করেনি উপকূলীয় বন বিভাগ। এতে হুমকির মুখে পড়েছে পারকি সৈকতের অস্তিত্ব ও সৌন্দর্য। সৈকত হয়ে পড়ে বালির পরিবর্তে কর্দমাক্ত চর। পর্যটকরা পড়ছেন বিড়ম্বনায়।
উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে আনোয়ারা পারকি সৈকতে আর্কিটেকচার পদ্ধতিতে প্রায় ২৩ হাজার ঝাউগাছ রোপণ করে বন বিভাগ। এছাড়া রায়পুর ইউনিয়নের উত্তর পরুয়াপাড়া ও গহিরা উঠান মাঝির ঘাট এলাকাও বঙ্গোপসাগরের বালু চরে আর্কিটেকচার পদ্ধতিতে ঝাউগাছ রোপণ করেন। তবে সাগরের ভাঙনের কবলে পরুয়াপাড়া ও উঠান মাঝির ঘাট এলাকার ঝাউগাছ সম্পন্ন বিলীন হয়ে যায়, অপর দিকে পারকি সৈকতের ঝাউগাছগুলোও ভাঙনের কবলে পড়ে অর্ধেকে নেমে আসছে। সাগরের ঢেউয়ে উপড়ে পড়া গাছগুলো বন বিভাগ বিভিন্ন সময় টেন্ডারের মাধ্যমে কাটলেও এর সংখ্যা জানাতে পারেনি বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী নুরুল আনোয়ার বলেন, সৈকত থেকে বিভিন্ন সময় বালু উত্তোলন ও সেখানে অপরিকল্পিত দোকানপাট গড়ে উঠার কারণে কাদা ও পলি জমে গেছে। ২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে পারকি সৈকতে আটকেপড়া ক্রিস্টাল গোল্ড জাহাজের কারণে সাগরের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে সৈকতের ঝাউবাগানের বেশি ক্ষতি হয়।
তিনি আরও বলেন, সৈকতের বালুচরের বালু সরে গিয়ে পলিমাটি জমে গেছে। তখন সৈকত ও ঝাউগাছ রক্ষায় বনবিভাগ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। এরপর সৈকতের আশপাশের এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের ফলে সৈকতের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ে। সৈকতের প্রাণ ঝাউবাগানের আকার দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। তাই ঝাউগাছ রক্ষায় আলাদা প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের আনোয়ারার দায়িত্ব প্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জার ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুনতাসির রহমান বলেন, পারকি সৈকত এলাকা থেকে কতসংখ্যক ঝাউগাছ টেন্ডারের মাধ্যমে কাটা হয়েছে তার হিসাব আমার কাছে নেই, পরে বিট কর্মকর্তা থেকে সংগ্রহ করে দেব। সৈকতের পাশ ঘিরে বিশাল খাসজমিতে নতুন করে ঝাউগাছ রোপণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হয়ে আসলে দ্রুত তা বাস্তবায়ন করা হবে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ঝাউগাছগুলো একদিকে যেমন বন্যা জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে রক্ষা করে, তেমনি পারকি সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষা করে। বন বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে এ ঝাউগাছ রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
