দ্রুত পরিবর্তনশীল গণমাধ্যম পরিবেশে সাংবাদিকতার জনআস্থাভিত্তিক ভূমিকা আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন মালয়েশিয়ার জাতীয় সংবাদ সংস্থা বারনামা-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দাতিন পদুকা নুর-উল আফিদা কামালুদ্দিন।বৃহস্পতিবার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হাওয়ানা ২০২৬ মিডিয়া ফোরামে স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে মানুষকে তথ্য দেয়, ব্যাখ্যা করে এবং সমাজকে সংযুক্ত রাখে। এটি নাগরিকদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনে এবং নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে।
তিনি আরও বলেন, পরিবর্তনের সময়ে সাংবাদিকতার এই মৌলিক দায়িত্ব কমে যায় না; বরং তা আরও অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তাই সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিশাল দায়িত্ব বর্তায়। তথ্য যাচাইয়ে সতর্কতা, প্রতিবেদন তৈরিতে শৃঙ্খলা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সততা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার উপ-যোগাযোগমন্ত্রী টিও নি চিং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপ-মহাসচিব নিক কামারুজামান নিক হুসিন, বার্নামার চেয়ারম্যান দাতুক সেরি ওং চুন ওয়াই এবং সম্পাদক-ইন-চিফ অরুল রাজু দুরার রাজ উপস্থিত ছিলেন।
হাওয়ানা ২০২৬ ওয়ার্কিং কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও থাকা নুর-উল আফিদা বলেন, সাংবাদিকতাকে টিকে থাকতে হলে নতুন দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং দর্শক সম্পৃক্ততার নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়। এটি পুরো শিল্পের সম্মিলিত চ্যালেঞ্জ। তাই পারস্পরিক সংলাপ, অংশীদারিত্ব এবং মানোন্নয়নে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।
এবারের হাওয়ানা মিডিয়া ফোরাম প্রসঙ্গে তিনি জানান, ছয় বছরের মধ্যে এবারই প্রথম মূল হাওয়ানা উদযাপন থেকে আলাদা দিনে পূর্ণাঙ্গ আকারে এই ফোরাম আয়োজন করা হয়েছে। পূর্বের মতো অর্ধদিবস নয়, বরং পুরো দিনজুড়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ায় অংশগ্রহণকারীরা আরও গভীর ও অর্থবহ মতবিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী এবং মালয়েশিয়ায় গণমাধ্যম শিল্প বর্তমানে একটি সংকটময় সন্ধিক্ষণে রয়েছে। প্রচলিত আয়ের উৎসগুলো চাপে রয়েছে, দর্শকদের আচরণ দ্রুত বদলাচ্ছে এবং তাৎক্ষণিক সংবাদ পরিবেশনের প্রতিযোগিতায় কখনও কখনও গভীরতা ও তথ্য যাচাই উপেক্ষিত হচ্ছে।
নুর-উল আফিদা আরও বলেন, সাংবাদিকতার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো জনআস্থা। বর্তমানে সেই আস্থাই সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার মুখে।
আগামী ২০ জুন জাতীয় সাংবাদিক দিবস (হাওয়ানা) ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে এ মিডিয়া ফোরামের আয়োজন করা হয়। এতে দেশব্যাপী ২০০-এর বেশি আমন্ত্রিত অতিথি অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রধান, সাবাহ ও সারাওয়াকের মিডিয়া প্রতিনিধি, বিদেশি সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধিরা, শিক্ষাবিদ, জনসংযোগ পেশাজীবী এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপ-যোগাযোগমন্ত্রী টিও নি চিং বলেন, মিডিয়া ইন্টিগ্রিটি স্ট্রেনদেনস ক্রেডিবিলিটি” শীর্ষক এবারের ফোরাম শুধু আলোচনা নয়, বরং সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
তিনি বলেন, আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সাংবাদিকতার স্থিতিশীলতা, টেকসই অগ্রযাত্রা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে মিডিয়ার সততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতি সাংবাদিকতাকে আরও দক্ষ ও উদ্ভাবনী করতে সাহায্য করতে পারে, তবে এটি কখনও মানবিক বিচারবোধ, সততা ও জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না।
তিনি বলেন, “এআই সাংবাদিকতার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। পরিবর্তিত মিডিয়া বাস্তবতায় এই ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।”
গণমাধ্যমের টেকসই উন্নয়নে মালয়েশিয়া সরকারের ‘মিডিয়া ইনোভেশন ফান্ড’-এর অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন টিও নি চিং। তিনি জানান, প্রথম ধাপে ৩৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ২৩ লাখ ৮০ হাজার রিঙ্গিত, দ্বিতীয় ধাপে ১৬টি প্রতিষ্ঠানকে ৫১ লাখ ৬০ হাজার রিঙ্গিত এবং তৃতীয় ধাপে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে ২৬ লাখ রিঙ্গিত সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চতুর্থ ধাপের আবেদন মূল্যায়নাধীন রয়েছে এবং পঞ্চম ধাপের আবেদন আগামী ১৪ মে পর্যন্ত চলবে। তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধিত স্থানীয় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ তহবিলের জন্য আবেদন করার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে সাংবাদিকদের কল্যাণে গঠিত ‘তাবুং কাসিহ হাওয়ানা’ তহবিলের কথাও উল্লেখ করেন উপমন্ত্রী। তিনি জানান, বার্নামা পরিচালিত এ উদ্যোগের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত দেশব্যাপী ৭২৮ জন গণমাধ্যমকর্মী উপকৃত হয়েছেন এবং মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৪০ হাজার রিঙ্গিতে।
চলতি বছরেই ১২২ জন সাংবাদিককে ৩ লাখ ৭০ হাজার রিঙ্গিত সহায়তা প্রদান করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
টিও নি চিং বলেন, সাংবাদিকতার কাজ শুধু পেশাগতভাবে কঠিন নয়, এটি ঝুঁকিপূর্ণও। তাই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সংবাদকর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।
