শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় আসার পর রেডিও ও টেলিভিশনে আযান দেওয়া বন্ধ করেছিলেন বলে সম্প্রতি একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তবে তার এই বক্তব্যের উৎস ও ব্যাখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। কারণ, পরবর্তীতে কালবেলা অনলাইনকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ বিষয়ে একাধিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন, এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যেও ‘দুই ধরনের’ কথা রয়েছে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া ভিডিও সাক্ষাৎকারে দিলারা চৌধুরী বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় আসার পর রেডিও ও টেলিভিশনে আযান দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরে একজন বয়স্ক ব্যক্তির প্রশ্নের পর শেখ মুজিবুর রহমান আবার তা চালু করেন বলেও তিনি জানান। একই সাক্ষাৎকারে তিনি মাদ্রাসা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বক্তব্য নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ বক্তব্যটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ দাবি করেন, রেডিও ও টেলিভিশনে আযান প্রচারের প্রথাই শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ছিল না।
আযান বন্ধ করা সংক্রান্ত বক্তব্যটির বিষয়ে কালবেলা অনলাইন স্বতন্ত্র অনুসন্ধান করে ওপেন সোর্সে দাবিটির সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পায়নি। পরে বক্তব্যটির উৎস ও তথ্যের ভিত্তি জানতে অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
প্রথমে তিনি জানান, ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কাগজের আর্কাইভ নিয়ে ‘ভিন্ন একটি গবেষণার’ সময় তিনি এ তথ্য পেয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমি একটি গবেষণার কাজ করতে গিয়ে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত কাগজের আর্কাইভগুলো পড়েছিলাম। এগুলো জাতীয় আর্কাইভে আছে। যদিও খুবই রেস্ট্রিক্টেড ছিল তখন (আওয়ামী লীগের আমলে)। আমি অনুমতি নিয়ে পড়েছিলাম। সেখানে পেয়েছিলাম তথ্যটি। তবে, তিনি শুধু রেডিও এবং টেলিভিশনে আযান দেওয়ার বিষয়টি বন্ধ করে দিয়েছিলেন এমনটা পেয়েছি। তখন মসজিদে কিন্তু আযান দেওয়া হতো।’
দিলারা চৌধুরীর এই তথ্য যাচাই করতে দুদিন ধরে এই প্রতিবেদক বেশ কয়েকজন স্কলার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে তাদের কেউই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দিলারা চৌধুরীর ভিডিওর কমেন্টে পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের প্রফেসর খ ম হারূন লিখেছেন, ‘রেডিও টিভিতে আজান চালু করা হয় এরশাদ আমলে। জেনে শুনে কথা বলুন।’
এরপর কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান তার ফেসবুক পোস্টে এ বিষয়ে আরও কিছু তথ্য দিয়ে বলেন, ‘এটি ডাহা মিথ্যা। বঙ্গবন্ধুর সময়ে রেডিও-টিভিতে আজান দেওয়ার প্রথাই ছিল না; এই প্রথা চালু করেন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘শেখ মুজিব মাদ্রাসা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। অথচ বঙ্গবন্ধুর এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা ইতিহাসে তো নেই-ই, লোকশ্রুতিতেও পাওয়া যায় না।’
বিষয়টি নিয়ে দিলারা চৌধুরীর নিজের বক্তব্যেও পরে ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। কালবেলা অনলাইনকে দেওয়া প্রথম বক্তব্যের একদিন পর তিনি নিজে থেকে এই প্রতিবেদককে ফোন করেন। এবার তিনি জানান, বাসায় ফিরে বইপত্র ঘেঁটে এ বিষয়ে দুই ধরনের তথ্য পেয়েছেন। একদল বলেছে, শেখ মুজিবুর রহমান এটি করেননি; আরেক দল বলেছে, তিনি করেছিলেন।
দ্বিতীয় বক্তব্যে তিনি আযান বন্ধের বিষয়টি ‘উহ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার ভাষায়, ‘আমি বাসায় এসে বইপত্র আরেকটু ঘাটাঘাটি করলাম। আমি এবার দুই রকমের কথা পড়েছি। একদল বলেছে যে উনি এটা করেন নাই। আরেক দল বলেছে যে উনি এটা করেছেন। এরপর আমি আরেকটু আর্কাইভে গিয়ে দেখলাম ১৯৭৩ সালে উনি ক্ষমতায় আসার পরে রেডিওতে যে কোরআন তেলাওয়াত হতো, ওইটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আযানের বিষয়টা উহ্য ছিল। এজন্য দু’ধরনের ইন্টারপ্রিটেশন আছে। কোরআন তেলাওয়াতের সাথে উনি আযানও বন্ধ করেছিলেন।’
আযান বন্ধের তথ্যের নির্দিষ্ট উৎস জানতে চাইলে দিলারা চৌধুরী বলেন, সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্ট তার নিজের সংগ্রহে নেই। অন্যদের লেখালেখি থেকে তিনি তথ্যটি পেয়েছেন বলেও জানান। তার ভাষ্য, যারা এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন, তাদের মধ্যে দুই ধরনের মত রয়েছে: একদল বলেছে, আযান বন্ধ করা হয়েছিল; আরেক দল বলেছে, তা করা হয়নি।
যেখান থেকে পড়েছেন, সেই বইগুলো ইন্টারনেটে আছে কি না, বা কোথাও পাওয়া যাবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। তাই অধিকাংশ বই ডোনেট করে দিয়েছি।’
কয়েকটি বইয়ের নাম উল্লেখ করে আবার তিনি বলেন, ‘ইরা অব শেখ মুজিবুর রহমান, তারপর মনিরুজ্জামান তালুকদারের একাধিক বই আছে। পিনাকী ভট্টাচার্য-এর একটা আছে, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ। তারপর তাজ হাশমির একটা বই আছে।’
