নিয়োগের সময় নিয়মিত পদ ছিল না, ছিল না উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও। অনেকের চাকরিতে প্রবেশের নির্ধারিত বয়সও পেরিয়ে গিয়েছিল। তবু প্রথমে দৈনিক মজুরিতে নিয়োগ, পরে বিশেষ পরীক্ষা- আর সেই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৬৫ জনই উত্তীর্ণ।
এরপর ধাপে ধাপে তাদের দেওয়া হয় স্থায়ী নিয়োগ। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে ক্যাশ বিভাগে চাকরি শুরু করা এসব কর্মচারীর অনেকে এখন প্রথম শ্রেণির সহকারী পরিচালক। আর পদোন্নতির ধারাবাহিকতায় তারা এখন ষষ্ঠ গ্রেডের উপপরিচালক হওয়ার দৌড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিপত্র বিশ্লেষণ ও অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন অফিসে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে ৩৬৬ জনকে মুদ্রা/নোট পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে কোনো পদ ছাড়াই তাদের মধ্যে ৩৬৫ জনকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় চাকরিতে স্থায়ী করা হয়। এ ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের নথিতে ‘একান্ত মানবিক কারণ’ দেখানোর কথা উল্লেখ রয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো- যে বোর্ড সভায় এসব কর্মচারীর প্রাথমিক নিয়োগকে অবৈধ ও আইন-বহির্ভূত বলা হয়েছিল, একই সভায় তাদের চাকরি স্থায়ী করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। নিয়োগের সঙ্গে জড়িত সাতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। তবে সেই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দৈনিক মজুরিতে শুরু, পরে স্থায়ী চাকরি
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন অফিসের ক্যাশ বিভাগে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে আসা ছেঁড়া, ময়লা ও ত্রুটিযুক্ত নোট গণনা ও বাছাইয়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ নোট ভল্টে জমা থাকত। প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে কাজ বকেয়া পড়ে যাওয়ায় দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে মুদ্রা/নোট পরীক্ষক-দ্বিতীয় মান পদে লোক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৩৬১তম সভার নথিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন শাখা অফিস পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়। এরপর ২০১০ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০১২ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসসহ অন্যান্য অফিসে মোট ৩৬৬ জনকে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে মুদ্রা/নোট পরীক্ষক-দ্বিতীয় মান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর এসব কর্মী চাকরি নিয়মিত করার জন্য বারবার আবেদন করেন। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৩৪৬তম সভায় উপস্থাপন করা হয়।
ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, বিভিন্ন অফিসে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কর্মরত ৩৬৬ জন মুদ্রা/নোট পরীক্ষককে চাকরিতে আবেদনের বয়স শিথিল করে বিশেষ পরীক্ষা নেওয়া হবে। হিউম্যান রিসোর্সেস ডিপার্টমেন্ট-১-এর মাধ্যমে ওই পরীক্ষা নেওয়ার পর উত্তীর্ণ প্রার্থীদের জেলা কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও অন্যান্য কোটায় নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। নতুন নিয়োগের তারিখ থেকে তারা ব্যাংকের বিদ্যমান বেতন-ভাতা, চিকিৎসা ও অবসরকালীন সুবিধা পাবেন বলেও সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়।
৩৬৫ জন পরীক্ষা দিলেন, সবাই পাস
পর্ষদের ওই সিদ্ধান্তের পর ২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। নথি অনুযায়ী, এতে ৩৬৫ জন অংশ নেন এবং সবাই উত্তীর্ণ হন।
এরপর গভর্নরের অনুমোদনক্রমে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, জেলা কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও অন্যান্য কোটা অনুসরণ করে চার ধাপে ২৩২ জনকে চাকরিতে নিয়মিত করা হয়। ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট, ১৬ অক্টোবর, ২৮ অক্টোবর এবং ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ- এই চার তারিখে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে ৩৬৫ জনের মধ্যে ২৩২ জনের চাকরি নিয়মিত হওয়ার পরও ১৩৩ জন দৈনিক মজুরি ভিত্তিতেই থেকে যান। তাদের চাকরি নিয়মিত করার পক্ষে ফের ‘মানবিক’ যুক্তি তুলে ধরা হয়।
‘একান্ত মানবিক কারণে’ ১৩৩ জনকে নিয়োগ
নথিপত্র বিশ্লেষণে জানা যায়, অবশিষ্ট ১৩৩ জনকে নিয়মিত করার পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুরোনো একটি নজির সামনে আনা হয়।
উপস্থাপন করা নথিতে বলা হয়, ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের বগুড়া অফিসে বিপুল-সংখ্যক নোট জমা হওয়ায় কাজ সম্পাদনের জন্য ১৬ জন মুদ্রা/নোট পরীক্ষক এবং ছয়জন ভল্ট পিয়নকে প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য সম্পূর্ণ অস্থায়ী দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে কাজের পরিমাণ বাড়ায় বিভিন্ন সময়ে তাদের চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়।
এভাবে প্রায় আট বছর কাজ করার পর তাদের চাকরি নিয়মিত করার বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদের ২৭৫তম সভায় ওঠে। ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারির ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নিয়োজিত মুদ্রা/নোট পরীক্ষক ও ভল্ট পিয়নরা পরীক্ষা দিয়ে নতুনভাবে নিয়োগ পাবেন।
এই নজির সামনে রেখেই ২০১৫ সালে অবশিষ্ট ১৩৩ জনকে নিয়মিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০১৪ সালে নিয়োগ পাওয়া ২৩২ জনের যুক্তিও উপস্থাপন করা হয়।
অবশিষ্ট ১৩৩ জনকে ভবিষ্যতে জেলা কোটা ও অন্যান্য কোটা সমন্বয় সাপেক্ষে শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া যাবে কি না; এ বিষয়ে সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলমের মতামতও নেওয়া হয়।
তার মতামতে ১৯৯৭ সালের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বিভিন্ন কোটা উল্লেখ করে বলা হয়, এসব ব্যক্তিকে উল্লিখিত কোটাগুলোর কোনো একটির সঙ্গে সমন্বয় করা সম্ভব কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে বলে তিনি মতামত দেন। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই আইনজীবীর মতামত নিলেও সেটিও মানেনি।
এরপর ২০১৫ সালের ২১ জুন বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদের ৩৬১তম সভায় উপস্থাপন করা হয়। সভায় বলা হয়, সংশ্লিষ্ট মুদ্রা/নোট পরীক্ষকরা পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশনা অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং তাদের মধ্য থেকে ২৩২ জনকে ইতোমধ্যে নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এসব বিষয় বিবেচনায় অবশিষ্ট ১৩৩ জনকেও ভবিষ্যৎ কোটা সমন্বয় সাপেক্ষে নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। পরিচালনা পর্ষদ শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি অনুমোদন করে।
সিদ্ধান্তে বলা হয়, দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নিয়োজিত ১৩৩ জন মুদ্রা/নোট পরীক্ষককে একান্ত মানবিক কারণে ভবিষ্যৎ কোটা সমন্বয় সাপেক্ষে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। নতুন নিয়োগের তারিখ থেকে তারা ব্যাংকের বিদ্যমান বেতন-ভাতা, চিকিৎসা ও অবসরকালীন সুবিধা পাবেন।
তবে গত ১০ বছরের বেশি সময় পার হলেও সেই কোটা এখনো সমন্বয় করা হয়নি।
যে সভায় নিয়োগ অবৈধ, সেখানেই স্থায়ী করার সিদ্ধান্ত
২০১৫ সালের ৩৬১তম বোর্ড সভার নথিতে এসব কর্মচারীর প্রাথমিক নিয়োগকে অবৈধ ও আইন-বহির্ভূত বলা হয়। একই সঙ্গে নিয়োগের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট মহাব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে যথোচিত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ‘সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোটা অনুসরণ না করে লোক নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহাব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে যথোচিত ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়।’
অর্থাৎ, সভায় যেই কর্মকর্তাদের প্রাথমিক নিয়োগকেই অবৈধ বলা হয়, সেই কর্মকর্তাদেরই আবার স্থায়ী করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। নথিপত্র বিশ্লেষণে বিষয়টি বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত হিসেবে উঠে এসেছে।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩৬১তম বোর্ড সভায় এসব বিধিবহির্ভূত নিয়োগের সঙ্গে জড়িত সাতজন কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।
এসব কর্মকর্তার মধ্যে আছেন- বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান জোদ্দার, খুলনা অফিসের মহাব্যবস্থাপক এ কে এম ফজলুর রহমান, বরিশাল অফিসের মো. গোলাম মোস্তফা, সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. নওশাদ আলী চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক নির্মল চন্দ্র ভক্ত, সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. মজিবর রহমান, নির্বাহী পরিচালক জিন্নাতুল বাকেয়া, উপ-মহাব্যবস্থাপক নূর-উন-নাহার। এসব কর্মকর্তার সবাই অবসরে চলে গেছেন।
এ প্রসঙ্গে খুলনা অফিসের তৎকালীন জিএম এ কে এম ফজলুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘তখন সব নিয়মকানুন মেনেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন কর্তৃপক্ষ যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবেই হয়েছে। এখানে আমার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘জড়িত থাকলে তো আমাদের ডাকত বা আমাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হতো; কিন্তু কিছুই নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া খুলনা অফিস নিয়োগ দিয়েছে সবার পড়ে।’
কোটার দোহাই, মানা হয়নি কোটাও
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন অফিসে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে মুদ্রা/নোট পরীক্ষক নিয়োগের সময় কোটা-সংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। কোথাও জেলা কোটা অনুসরণ করা হয়নি, আবার প্রধান কার্যালয়ে সংরক্ষিত জেলা কোটার তথ্যও নেওয়া হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এসব কারণে সাত মহাব্যবস্থকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ।
তথ্য বলছে, জেলা কোটায় ৩০ শতাংশ প্রার্থী নিয়োগ দেওয়ার বিধান-সংবলিত একটি মতামত দেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম। সে হিসেবে ৩৬৫ জনকে কোটায় নিয়োগ দিতে হলে ১২১৬টি পদ থাকতে হবে। ১২১৬টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে তার পরিপ্রেক্ষিতে ৩৬৫ জনকে বৈধভাবে কোটায় নিয়োগ দেওয়া বিধিসম্মত হবে।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নিয়োগে কোনো পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা বিধিবহির্ভূত। অন্যদিকে, ৩৬৫ জনকে নিয়োগ দিলে তার ৩০ শতাংশ কোটায় নিয়োগ দেওয়া যাবে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিধানও মানেনি।
আইন অনুযায়ী, ১২১৬ জনকে নিয়োগ দিলে সেখানে ৩৬৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া যাবে জেলা কোটায়।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩৬৫ জনকে নিয়োগ দিয়েছে পরে সমন্বয়ের কথা বলে। সে হিসেবে ৩৬৫ জন নিয়োগ দিলে ঢাকায় ৬ দশমিক ৯৬ হারে সর্বোচ্চ ২৫ জন নিয়োগ দেওয়া যায়। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নিয়োগ আইনসম্মত নয়, তবু নিজেদের ইচ্ছেমতো বানানো এই বিধানও মানা হয়নি।
ঢাকা থেকেই নিয়োগ দেওয়া হয় ৩১ জনকে। একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সে সময়কার কর্মকর্তাদের নিজেদের বানানো আইনে জামালপুর থেকে সর্বোচ্চ ৬ জন নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে ১১ জনকে। বগুড়া থেকে ৮ জনের হিসাব মিললেও নিয়োগ দেওয়া হয় ২৫ জনকে। রাজশাহী থেকে বানানো কোটার হিসাবে ৬ জন হলেও নিয়োগ দেওয়া হয় ২৮ জনকে। খুলনায় ৬ জন হলেও নিয়োগ দেওয়া হয় ২৪ জনকে। বরিশাল থেকে ৬ জন হলেও নিয়োগ দেওয়া হয় ২০ জনকে। এভাবেই ইচ্ছামতো নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এক পরীক্ষায় সবাই পাস, এরপর পদোন্নতির সিঁড়ি
২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বিআইবিএমের মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। ৩৬৫ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সবাই উত্তীর্ণ হন।
এরপর ধাপে ধাপে এই কর্মচারীদের দেওয়া হয় নিয়োগ। তবে এসব কর্মকর্তা শুধু চাকরি নিয়মিত হয়েই থেমে থাকেননি। দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যাদের যাত্রা শুরু, তারা পরবর্তীতে তিন ধাপে পদোন্নতি পেয়ে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী পরিচালক হয়েছেন।
বর্তমানে তারা ষষ্ঠ গ্রেডের উপপরিচালক হিসেবে পদোন্নতির দৌড়ে রয়েছেন।
একটি অনিয়মিত বা বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাওয়া চাকরি পরবর্তী সময়ে যদি নিয়মিত ক্যারিয়ার ট্র্যাকে ঢুকে যায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু নিয়োগের সময়টুকুতে সীমাবদ্ধ থাকে না। বেতন, পদোন্নতি, ঋণ, অবসর সুবিধা- সবকিছুর ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘এগুলো নজিরবিহীন ঘটনা। ৩৬৫ জন পরীক্ষা দিয়েই সবাই পাস। এতে বুঝা যায় এখানে কী ধরনের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। সেই কর্মচারীরা আবার পদোন্নতি পেয়ে এখন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হয়ে গেছেন। তারা হয়ত শিগগির পদোন্নতি পেয়ে উপপরিচালকও হয়ে যাবেন।’
চাকরির পর প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলেছে, চাকরি পাওয়ার পরেই এসব কর্মকর্তা ভবিষ্যতে তদন্তের মুখে পড়ার আশঙ্কা করেছেন। তদন্তে হলে চাকরি হারাতে পারেন এসব কর্মকর্তারা- এ আশঙ্কা থেকে তারা যোগদানের পরপরই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নিয়ে নেন।
পরে সহকারী পরিচালক হিসেবে পদোন্নতির পরে সেই ঋণ সমন্বয় করেন ১ কোটি ২০ লাখ টাকা করে প্রায় সবাই। এ ছাড়া গাড়ি কেনার জন্য কার ঋণ ৩০ লাখ টাকাও নিয়েছেন অনেকেই।
সে হিসেবে এসব কর্মকর্তা প্রত্যেকেই ১ কোটি ২০ লাখ থেকে প্রায় দেড়কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন। গড়ে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা করে ঋণ ধরলেও প্রায় ৪৯২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এসব কর্মকর্তাদের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাওনা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘এ ধরনের নিয়োগ সম্পূর্ণ অবৈধ। তৎকালীন মানবিক গভর্নর হিসেবে পরিচিতি পাওয়া আতিউর রহমান নিজের ইচ্ছে ও খেয়ালখুশিমতো নিয়োগ দিয়েছেন। এসব নিয়োগের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দলের অনুসারী কর্মীদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ঢোকানো হয়েছে। এই নিয়োগের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনেক অযোগ্য লোক ঢুকে পড়েছে। এ ছাড়া এই কর্মচারীদের উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার উপরে সিনিয়রিটি দেওয়া হয়েছে, যা নজিরবিহীন ঘটনা।’
আরও এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ওই কর্মকর্তারাও বুঝেছেন তাদের নিয়োগ বিধিসম্মত নয়। যে কারণে তারা চাকরি পাওয়ার পরপরই বিপুল অর্থের ঋণ নিয়ে নিয়েছেন। এত মোটা অঙ্কের ঋণ বাকি রেখে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে এই কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করাও কঠিন। এই কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাংক এক প্রকার জিম্মি।’
জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যমসারির একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ ও প্রমোশন দেওয়ার ফলে ক্যাশের এই কর্মকর্তারা আজ যে পদ আঁকড়ে আছেন, সে পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হতো। ফলে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অযোগ্যদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারি চাকরি প্রদান করে দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। ফলে সংবিধানের ২৭ ও ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদের ব্যত্যয় ঘটেছে।’
৩ থেকে ৫ লাখ টাকার অভিযোগের অনুসন্ধান কোথায়?
এই নিয়োগকে ঘিরে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, নিয়োগ পাওয়া ৩৬৫ জন কর্মচারীর সবাই সেসময়কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশী। এ ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয় অনেককে।
পরবর্তী সময়ে তাদেরকে সব আইন পাস কাটিয়ে বৈধতা দেওয়ার জন্য নামমাত্র পরীক্ষা নেওয়া হয়। একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, সেসময় এই নিয়োগকে ঘিরে মোটা অঙ্কের বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এসব কর্মচারীদের নিয়োগ স্থায়ী করতে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা করে নেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি বা স্বতন্ত্র প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহ নাভিলা কাশফি কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৪-১৫ সালের নিয়োগে অনুমোদিত পদ, প্রযোজ্য নিয়োগবিধি ও কোটা নীতি অনুসরণ না করা হয়ে থাকলে, তা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশনস, ২০০৩ অনুযায়ী নিয়োগ, বয়সসীমা শিথিলকরণ ও পদোন্নতির বৈধতা সংশ্লিষ্ট বিধি ও অনুমোদনের আলোকে যাচাই করতে হবে। বিশেষত, দৈনিক মজুরিভিত্তিক চাকরি থেকে নিয়মিতকরণ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিধিসম্মত অনুমোদন না থাকলে তা বৈধতার প্রশ্ন সৃষ্টি করবে। মানবিক বিবেচনা কোনোভাবেই আইন ও নিয়োগবিধির বিকল্প হতে পারে না। তবে চূড়ান্ত আইনগত সিদ্ধান্তের জন্য নিয়োগসংক্রান্ত নথি, বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট প্রবিধান যাচাই করা অপরিহার্য।’
‘আমাদের ডেপুটি ডিরেক্টর পদে প্রমোশন কালকের মধ্যে হয়ে যাবে’
৩৬৫ জনের মধ্যে একজন মো. এরশাদুল হক। নিয়োগ-সংক্রান্ত চিঠিতে তার সিরিয়াল ১১৬ নম্বর।
জানতে চাইলে এরশাদুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের ডেপুটি ডিরেক্টর পদে প্রমোশন কালকের (রোববার) মধ্যে হয়ে যাবে।’
পরে তার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি বলেন, ‘আপনি কে ভাই। কালবেলার কোথায় চাকরি করেন? কালবেলার অফিস কোথায়? আপনি এখন এগুলো নিয়ে প্রশ্ন করতেছেন কেন? আপনাকে কে করতে বলেছে, আপনি আমার নম্বর কই পাইলেন?’
এরপর তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের ব্যাংক প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেন। তারা কীভাবে নিয়োগ দিয়েছে তারাই আপনাকে বলবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য
বিস্তারিত জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় বাংলাদেশের বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে। তবে তাকে একাধিকবার ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন লিখে ম্যাসেজ পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের সঙ্গে। তিনি বিস্তারিত প্রশ্ন শুনে বলেন, ‘আমি তো এভাবে মন্তব্য করতে পারব না। আপনার প্রশ্নগুলো আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখে দিলে আমি সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে বিস্তারিত শুনে আপনাকে বলতে পারব।’
পরে তাকে সুনির্দিষ্ট ৬টি প্রশ্ন লিখে ম্যাসেজ করা হয়। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এসব ব্যাপারে জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ফলে নথিপত্রে উঠে আসা নিয়োগপ্রক্রিয়া, কোটা অনুসরণ, বিশেষ পরীক্ষা, পরবর্তী পদোন্নতি এবং বিপুল অঙ্কের ঋণের বিষয়গুলো নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
