৫ মিনিটের ভিডিওতে রোনালদো যা বললেন

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ এএম

পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর দেখা যাবে না ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। দীর্ঘ ২৩ বছরের পথচলা শেষে জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন পর্তুগিজ এই মহাতারকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত দীর্ঘ ভিডিও বার্তায় নিজের ক্যারিয়ার, ঐতিহাসিক গোল, অর্জন আর দেশের জার্সিতে খেলার জন্য ত্যাগের কথা স্মরণ করেছেন তিনি। বিদায়বেলায় জানিয়েছেন, সাত নম্বর জার্সি অন্যদের হাতে তুলে দিলেও সেটি পরার গর্ব আজীবন তারই থাকবে।

ফেব্রুয়ারিতে ৪১ বছরে পা রাখা রোনালদো পর্তুগালের হয়ে খেলেছেন ২৩৪টি ম্যাচ। গোল করেছেন ১৪৬টি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড দুটিই তার দখলে। নেশন্স লিগে কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে টানাপোড়েন, দলের অনুশীলন ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়া এবং নিষেধাজ্ঞার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

বিদায়ী বার্তায় রোনালদো বলেন, ‘পর্তুগালের মানুষদের বলছি, জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। জার্সিটি কখনোই শুধু আমার বলে মনে করিনি। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, এর মর্যাদা রক্ষা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেডিয়ামে গায়ে জড়িয়ে মাঠে নামার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব আমার হয়েছে। এবার সময় এসেছে জার্সিটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কারণ, কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নেওয়া যায় না, হৃদয়েরও ভূমিকা থাকে। ২০০৩ সালের আগস্টে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং যা চিরতরে আমার জীবন বদলে দিয়েছে, তার এবার সমাপ্তি ঘটছে।’

জাতীয় দলের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে রোনালদো বলেন, ‘জাতীয় দলের হয়ে যা কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেসব ভাবলে শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে মানুষদের কথা। মনে পড়ে বিদেশে থাকা সেই পর্তুগিজদের, যারা ৯০ মিনিটের জন্য হলেও নিজেদের দেশকে একটু বেশি কাছে অনুভব করেছেন। মনে পড়ে লাখো পর্তুগিজ মানুষের কথা, যাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কখনো দেখা হয়নি, অথচ যারা আমার জীবনের অংশ হয়ে আছেন। কারণ, ফুটবল শেষ পর্যন্ত শুধু একটি ম্যাচ নয়, ফুটবল মানুষের গল্প।’

নিজের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা সব সময়ই করেছেন বলে জানান রোনালদো। তার কথায়, ‘জাতীয় দলের ক্যারিয়ারে আমি সব সময় নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। জিততে চেয়েছি, সেরা হতে চেয়েছি, ইতিহাস গড়তে চেয়েছি। নিজের কাছে সব সময় অনেক বেশি প্রত্যাশা রেখেছি। সব সময় আরও বেশি চেয়েছি, বিশ্বাস করেছি আমরা আরও দূর যেতে পারি। এই জার্সির জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি।’

ক্যারিয়ারের উত্থান-পতনের কথাও তুলে ধরেছেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘এমন অনেক বিকাল ও রাত এসেছে, যা ছিল নিখুঁত। এমন জয় আছে, যা কখনো ভুলব না। আবার এমন হারও আছে, যা মনে পড়লে এখনো কষ্ট হয়। আমিও ব্যর্থ হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি। এমন সময়ও এসেছে, যখন পর্তুগালের মানুষ যা চেয়েছেন, তা দিতে পারিনি। কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি। সবচেয়ে বড় কথা, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব কখনো হারাইনি।’

সময় পেরিয়ে গেলেও মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন রোনালদো। তার ভাষায়, ‘এই বছরগুলোতে খুব সাধারণ কিছু বিষয় শিখেছি। গোলের স্মৃতি একসময় ফিকে হয়ে যায়, ট্রফি জাদুঘরে জায়গা পায়, রেকর্ডও একদিন ভেঙে যায়। কিন্তু এমন একটি বিষয় আছে, যা সময় কখনো মুছে দিতে পারে না-মানুষের হৃদয়ে আমাদের জায়গা। আমার কোনো গোল যদি কখনো আপনাদের আনন্দ দিয়ে থাকে, কাউকে আলিঙ্গন করতে, কোনো কষ্ট ভুলে থাকতে কিংবা নিজের দেশ নিয়ে গর্ব অনুভব করতে সাহায্য করে থাকে, তাহলে আমার সবকিছু সার্থক।’

নতুন প্রজন্মের প্রতি আস্থার কথাও বলেছেন তিনি। রোনালদো বলেন, ‘পর্তুগালের সব সময় এমন তরুণদের প্রয়োজন, যারা স্বপ্ন দেখে; এমন খেলোয়াড়দের প্রয়োজন, যারা কখনো হাল ছাড়ে না। এমন নতুন প্রজন্ম প্রয়োজন, যারা বিশ্বাস করে- এমন জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব, যেখানে আগে কেউ পৌঁছাতে পারেনি। যে দেশ নতুন নতুন নায়ক তৈরি করে যেতে পারে, সেই দেশ কখনো নিজের ওপর বিশ্বাস হারায় না।’

জাতীয় দলের সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রোনালদো। বলেছেন, ‘আমার সতীর্থদের বিশেষভাবে কিছু বলতে চাই। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি আলোচনা, মাঠে নামার আগের প্রতিটি নীরব মুহূর্তের জন্য ধন্যবাদ। একসঙ্গে উদযাপন করা প্রতিটি জয় এবং আমাদের আরও শক্তিশালী করে তোলা প্রতিটি হারের জন্যও ধন্যবাদ। তোমাদের অধিনায়ক হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, কিন্তু কোনো অধিনায়ক একা পথ চলে না। তোমরাও আমার গল্পের অংশ।’

কোচ, কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, কিট ম্যানেজারসহ দলের সঙ্গে কাজ করা প্রত্যেকের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। রোনালদো বলেন, ‘তোমাদের অনেকেই কখনো ছবিতে জায়গা পাওনি। কিন্তু তোমাদের ছাড়া সেই ছবিগুলো কখনো সম্ভব হতো না।’

পরিবারের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে এই স্বপ্ন ভাগ করে নেওয়ার জন্য পরিবারকে ধন্যবাদ। আমার অনুপস্থিতি, ত্যাগ এবং জাতীয় দলকে সময় দিতে গিয়ে পরিবারের জন্য নির্ধারিত সময়ের একটা অংশ দিতে না পারার বিষয়টি বোঝার জন্য ধন্যবাদ। আমি এত দূর আসতে পেরেছি, কারণ আমরা সব সময় একসঙ্গে পথ চলেছি।’

পর্তুগালের জাতীয় সংগীত বাজার মুহূর্তটিকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখবেন রোনালদো। তার ভাষায়, ‘একটি দৃশ্য আমি সব সময় মনে রাখব। জাতীয় সংগীত শুরু হওয়ার মুহূর্তটি, চারপাশে তাকিয়ে সতীর্থদের দেখি, গ্যালারি দেখি, শিশু, মা-বাবা ও দাদা-দাদিদের দেখি। দেখি দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা পর্তুগিজদের। ওই কয়েক মিনিটের জন্য আমরা আর আলাদা থাকি না। সেখানে কোনো ক্লাব নেই, রং নেই, শ্রেণি নেই, পেশা নেই, মতভেদ নেই। থাকে শুধু একটি আবেগ- সেটি পর্তুগাল। এই অনুভূতি আমি সারা জীবন বয়ে বেড়াব।’

জাতীয় দলের হয়ে মাঠের সময় শেষ হলেও পর্তুগালের প্রতি ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না বলে জানিয়েছেন রোনালদো। তিনি বলেন, ‘আজ জাতীয় দলের হয়ে মাঠে আমার সময় শেষ হচ্ছে। মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি। নিজের পথচলা নিয়ে গর্বিত এবং জানি, পর্তুগালের জন্য নিজের সবটুকু দিয়েছি। কিন্তু আমি কখনোই তোমাদের একজন হওয়া বন্ধ করব না। পর্তুগালের প্রতিটি জয়েই আমি আগের মতো কষ্ট পাব, উল্লাস করব, উদযাপন করব।’

নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগকেই দেখছেন এই তারকা। তার শেষ কথাগুলো ছিল, ‘বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য সারা জীবন কাজ করেছি। আজ বুঝতে পারছি, সবচেয়ে বড় জয় ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর দেশের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার অর্জন করা। এই ২৩ বছরের জন্য ধন্যবাদ। আমার ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য ধন্যবাদ। মাদেইরার ছোট্ট এক শিশু হিসেবে বলের পেছনে ছুটতে ছুটতে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা বাঁচানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। সাত নম্বর জার্সিটি থেকে যাবে; কিন্তু সেটি পরার গর্ব চিরকাল আমার থাকবে। পর্তুগাল সব সময় আমার ভেতরে থাকবে। আবার দেখা হবে।’

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন