কায়রো বইমেলায় মানুষের ঢল

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৩ এএম

আফছার হোসাইন, কায়রো (মিশর)
মিশরে বিশ্বের অন্যতম সাহিত্য আয়োজন কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলায় (Cairo International Book Fair) এ পর্যন্ত ৪৫ লাখেরও বেশি দর্শনার্থীর সমাগম ঘটেছে। বিপুলসংখ্যক পাঠক, লেখক ও সংস্কৃতি প্রেমীর অংশগ্রহণে এবারের আসর ইতোমধ্যেই রেকর্ড জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপসহ বিশ্বের মোট ৮৩টি দেশ থেকে ১,৪৫৭টি প্রকাশনী এই মেলায় অংশ নিয়েছে। ৬,৬৩৭ জন প্রদর্শকের উপস্থিতি এবং প্রায় ৪০০টি সাংস্কৃতিক কর্মশালা মেলাটিকে দিয়েছে বহুমাত্রিক রূপ। বই প্রদর্শনীর পাশাপাশি মেলায় আয়োজন করা হয়েছে নানা সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি। এর মধ্যে রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক সেমিনার, সাহিত্য আড্ডা, শিল্পকলা প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং শিশু ও তরুণদের জন্য বিশেষ কার্যক্রম। বইপ্রেমীদের প্রাণের মিলন মেলায় পরিণত হওয়া এই আয়োজন মিশরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামি স্কলার ও বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুল মালেকের বিখ্যাত আরবি গ্রন্থ ‘আল-মাদখাল ইলা উলুমিল হাদিসিশ শরিফ’ ২০২১ সালের মতো এবারও বেস্টসেলার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের এই আসরে তার নতুন গবেষণামূলক গ্রন্থগুলো আন্তর্জাতিক পাঠকদের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সায়মুম আল মাহেদী বলেন, কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬ কেবল একটি প্রকাশনা প্রদর্শনী নয়; এটি সমসাময়িক বিশ্বের জ্ঞান, চিন্তা ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দরবার। নিউ কায়রোর ইজিপ্ট ইন্টারন্যাশনাল এক্সিবিশন সেন্টারে বইয়ের এই বিশাল সমাবেশ প্রমাণ করে—ডিজিটাল যুগেও বই তার প্রভাব ও প্রয়োজনীয়তা হারায়নি। নাজিব মাহফুজের চিন্তাকে প্রতিপাদ্য করে আয়োজিত এবারের মেলা পাঠককে কেবল বইয়ের পৃষ্ঠায় নয়, বরং ইতিহাস, মানবতা ও মূল্যবোধের গভীরে নিয়ে যায়। আল-আযহারের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি অনুভব করি, এ মেলা আমাদের জন্য শুধু পাঠের সুযোগ নয়, বরং চিন্তার পরিসর বিস্তৃত করার এক অনন্য ক্ষেত্র। লেখক, গবেষক ও পাঠকের সরাসরি সংলাপ—এই বইমেলাকে জ্ঞানচর্চার এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিণত করেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশি আরেক শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান খান আজহারী বলেন, আরবের প্রথম নোবেল বিজয়ী নাগিব মাহফুজের নামে উৎসর্গিত এই মহোৎসব আরব বিশ্বের সবচেয়ে বিশাল ইসলামিক বইমেলা, যা জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের পরই বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে বিব্রত। এখানে ৮৩ দেশের ১,৪৫৭ প্রকাশকের মতো আমাদেশের বাংলাদেশী লেখকদের বইও স্থান পেয়েছে—রীতিমতো বেস্টসেলার তালিকায়। বিশেষ করে জাতীয় মসজিদের সম্মানিত খতিব মুফতি আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহসহ অসংখ্য লেখকের গ্রন্থগুলো জনপ্রিয়তায় ঝলমল করছে। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী হিসেবে আমি গর্বিত—অনেকবার এসেছি, অগণিত বই সংগ্রহ করেছি, যা বছরের অন্য সময়ে এমনভাবে সম্ভব নয়। এই জ্ঞান-উৎসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে মন ভরে উঠছে অপার আনন্দে, সহযাত্রী প্রকাশনার মতো সঙ্গী হৃদয়ে জাগছে নতুন আলোর স্ফুলিঙ্গ।

এবারের বইমেলাটি উৎসর্গ করা হয়েছে মিশরের কিংবদন্তি সাহিত্যিক ও নোবেলজয়ী লেখক নাগিব মাহফুজের প্রতি। তাঁকে ‘পার্সোনালিটি অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে সম্মান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এবারের আসরে ‘গেস্ট অব অনার’ বা অতিথি দেশ হিসেবে সম্মাননা পাচ্ছে রোমানিয়া।

মিশরের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী মেলার সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করে ন্যাশনাল এক্সিবিশনস অ্যান্ড কনফারেন্সেস কোম্পানি এবং ইজিপ্ট ইন্টারন্যাশনাল এক্সিবিশন অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টারের কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীদারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, বিপুল দর্শনার্থীর চাপ সামাল দিয়ে সুষ্ঠুভাবে আয়োজন সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের নিরলস পরিশ্রম প্রশংসার দাবি রাখে।

প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির পৃষ্ঠপোষকতায় ৫৭তম কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২১ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, নিউ কায়রোর ইজিপ্ট ইন্টারন্যাশনাল এক্সিবিশন অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টারে। এবারের মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—যে এক ঘণ্টা পড়া বন্ধ করে, সে শতাব্দীর পেছনে পড়ে যায়।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর