‘খায় সবাই মিলে, নাম হয় শুধু আমার’: ছাত্রদল নেতার স্বীকারোক্তি

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন ঢাকা-কুয়াকাটা ও ভোলা-বরিশাল মহাসড়কে শাখা ছাত্রদলের শীর্ষ ও পদধারী নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে।

মঙ্গলবার (১৯ মে) ভোররাতে মহাসড়কে মাছের গাড়ি আটকে হুমকি-ধমকি দিয়ে একাধিক বিকাশ এজেন্টের মাধ্যমে প্রায় লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অভিযুক্তরা।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সহ-সভাপতি মিয়া বাবুল, সহ-সভাপতি মো: মিথুন, সহ-সভাপতি আকিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: ইব্রাহিম হোসেন স্বজন এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: ইমরান মাহমুদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: শাখাওয়াত, সহ-সাংগাঠনিক সম্পাদক মো: হায়দার মুন্সি, শাহরিয়ারসহ একাধিক নেতাকর্মী সরাসরি এই চাঁদাবাজির সাথে জড়িত।

সাধারণ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো: মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসাইন শান্ত, সাংগঠনিক সম্পাদক মো: মিজানুর রহমানসহ ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের ছত্রছায়ায় মহাসড়কে এই নিয়মিত চাঁদাবাজি চলছে। আদায় করা চাঁদার একটি বড় অংশ তাদের পকেটেও যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে মহাসড়কে মাছের গাড়ি আটকে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের তিনটি বিকাশ এজেন্ট অ্যাকাউন্টে মোট ৯৪ হাজার ৯০০ টাকা পাঠাতে বাধ্য করা হয় ব্যবসায়ীদের। টাকা পাঠানো নিশ্চিত করতে প্রতিবারই মাছ ব্যবসায়ীর ফোন নাম্বার থেকে কল দিয়ে নিশ্চিত করা হয়।

পরে সকাল ৯টার দিকে অভিযুক্ত ছাত্রদল সহ-সভাপতি মিয়া বাবুল ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো: হায়দার মুন্সিসহ মোট চারজন সরাসরি ওই সব দোকানে গিয়ে টাকা তুলে নিয়ে আসে।

চাঁদাবাজির টাকা লেনদেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোলা রোড সংলগ্ন একটি ফার্মেসি, কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াজ্জিনের দোকান এবং হলের একটি দোকান ব্যবহার করা হয়। ব্যবসায়ী লোকমানের এজেন্ট নাম্বারে তিন দফায় মোট ৪৪ হাজার ৯০০ টাকা পাঠানো হয়। সকাল ৬টা ৫৬ মিনিটে ১৫ হাজার টাকা (ট্যাক্স আইডি: DEJ6CZSFRO)। পরে সকাল ৭টা ২০ মিনিটে ৯ হাজার ৯০০ টাকা (ট্যাক্স আইডি: DEJ4D021DU)। এরও পরে সকাল ৭টা ৩৬ মিনিটে ২০ হাজার টাকা (ট্যাক্স আইডি: DEJ6D09NZG)।

ফার্মেসির লোকমান বলেন, ‘সকাল ৯টার দিকে মিয়া বাবুল আমাকে কল দিয়ে বলেন- ‘মামা, আপনার নাম্বারে টাকা পাঠাইছি। আমার এক বন্ধু অসুস্থ, টাকাটা জরুরি লাগবে।’ পরে আমি নাম্বার মিলিয়ে তাকে ৪৪ হাজার ৯০০ টাকা ক্যাশ বুঝিয়ে দিই।

কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াজ্জিনের দোকান। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াজ্জিনের এজেন্ট নাম্বারে দুই দফায় ৩৫ হাজার ৩০০ টাকা পাঠানো হয়। সকাল ৬টা ৩৩ মিনিটে ২৫ হাজার ৩০০ টাকা (ট্যাক্স আইডি: DEJ6CZNO20)। পরে সকাল ৭টায় ১০ হাজার টাকা (ট্যাক্স আইডি: DEJ7CZU7YT)।

মুয়াজ্জিন সাহেব বলেন, ‘সকাল ৯টা ১১ মিনিটে আমাকে কল দিয়ে বলা হয় ‘হুজুর আপনি কই? আপনার নাম্বারে টাকা গেছে, টাকাগুলো লাগবে।’ আমি দ্রুত দোকানে আসি। কিন্তু আমার কাছে পর্যাপ্ত ক্যাশ না থাকায় অন্য দোকান থেকে ২৫ হাজার টাকা এনে তাদের দিই। বাকি ১০ হাজার টাকা তাদের দেয়া একটি নাম্বারে সেন্ড মানি (ট্যাক্স আইডি: DEJ6D2RD8I) করে দিতে বলায় আমি পাঠিয়ে দিই। তারা চার থেকে পাঁচজন আসছিল একসাথে।

চাঁদাবাজির অবশিষ্ট টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ভেতরের দোকানদার সেলিম মামার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তোলন করে নিয়ে যায় অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতারা।

চিংড়ি রেনু উৎপাদনকারী হ্যাচারি মালিক জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমার দু’টি চিংড়ির রেনুবাহী গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের শিক্ষার্থীরা আটকে চাঁদা দাবি করে। আমি প্রথমে ৯৯৯ এবং সংশ্লিষ্ট থানায় কল করেও কোনো প্রতিকার পাইনি। পরে আমার কাছ থেকে যারা মাছ কিনেছেন, তারা বাধ্য হয়ে বিকাশে প্রায় দেড় লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে গাড়ি উদ্ধার করেন। আরেকটি গাড়ি থেকে চাঁদা নিতে না পেরে তারা গাড়ি ভাঙচুর করেছে এবং চালককে মারধর করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মিঞা বাবুল বলেন, আমাকে এখানে ফাঁসানো হচ্ছে ভাই। খায় সবাই মিলে কিন্তু নাম হয় শুধু আমার এর সাথে এলাকার কিছু লোকও জড়িত আছে। আমি দ্রুত সাংবাদিকদের মাধ্যমে মূলহোতাদের নাম সামনে নিয়ে আসবো।

সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাফি শিকদার বলেন, চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য অবৈধ কাজের সাথে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে তথ্য ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সংরক্ষণের কাজ চলমান রয়েছে। প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের সেক্রেটারি শান্ত ইসলাম আরিফ বলেন, ‘আমি গণমাধ্যমের দেখছি আসলে এই বিষয়ে আমার অবগত ছিলাম না যদি এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, আমাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার। দলের নাম ব্যবহার করে যদি কেউ অন্যায় বা অনিয়মের সাথে জড়িত থাকে এবং তা যদি প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবো।’

ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটি গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিমের অন্যতম সদস্য কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারিক হাসান মামুন বলেন, অভিযোগ বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। আমরা নিউজ দেখেছি। অভিযুক্তদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ চলতেছে।সংবাদ বিশ্লেষণ

বরিশাল বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: ইসমাইল হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যে চাঁদাবাজি করছে। বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি আমাদের ঊর্ধ্বতন মহলেও জানে। আমাদের সকল অফিসারদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি সংশ্লিষ্ট এলাকায় টহল বাড়িয়েছি। উপযুক্ত প্রমাণসহ হাতেনাতে ধরতে পারলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন