জাতীয় বাজেটকে অনেকেই শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখেন। কিন্তু একটি বাজেট আসলে তার চেয়েও অনেক বড় কিছু। এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং উন্নয়নের অগ্রাধিকারকে একত্রে ধারণ করে। একটি দেশের সরকার কোন খাতে বিনিয়োগ করবে, কাদের পাশে দাঁড়াবে, কোন শ্রেণিকে এগিয়ে নিতে চায় এবং ভবিষ্যতের জন্য কী ধরনের অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায় এসবের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে জাতীয় বাজেটে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কারণ এটি এমন এক সময়ে উপস্থাপিত হয়েছে, যখন বাংলাদেশ একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে; অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রত্যাশাও বেড়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই বাজেটকে শুধু অঙ্কের দিক থেকে মূল্যায়ন করলে এর প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়বে না। বরং এর ভেতরে যে নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটে একদিকে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি একটি দেশের উন্নয়নের একমাত্র সূচক হতে পারে না। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই বাস্তবায়িত হয়, যখন সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন (Inclusive Development)-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলার চেষ্টা, যেখানে উন্নয়নের সুবিধা শুধু শহর বা নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কৃষক, শ্রমিক, নিম্ন আয়ের পরিবার, নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও সমানভাবে উপকৃত হবে।
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হলেও মানবসম্পদে বিনিয়োগ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা আয়ারল্যান্ডের মতো দেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।
বাংলাদেশও আজ একই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে দক্ষ মানবসম্পদই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই কারণেই শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণের বিনিয়োগ। বাজেটে শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তবে বরাদ্দ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে বরাদ্দের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না।
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে সামাজিক ব্যয় নয়, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবেই দেখা উচিত।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা অবকাঠামো, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির লক্ষ্য হলো নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষম জনশক্তি গড়ে তোলা।
একটি রাষ্ট্রের পুনর্গঠন কেবল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া কার্যকর গণসেবা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিংবা টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।
এই কারণেই বাজেট ২০২৬-২৭-কে কেবল একটি অর্থবছরের আর্থিক পরিকল্পনা হিসেবে নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠনের নীতিপত্র হিসেবেও দেখা যায়। এর সাফল্য অবশ্যই নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কারণ ইতিহাস বলে ভালো বাজেটের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভালো বাস্তবায়ন।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই নিশ্চিত হয়, যখন তার সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে। কেবল উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বড় বড় অবকাঠামো কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ একটি রাষ্ট্রকে উন্নত করে না; বরং উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন একজন কৃষক, শ্রমিক, প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী, নিম্ন আয়ের পরিবার কিংবা সমাজের নীরব সেবায় নিয়োজিত মানুষও রাষ্ট্রের উন্নয়নের অংশীদার হন। এই দর্শন থেকেই আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণার জন্ম।
আমার দৃষ্টিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত ও লক্ষ্যভিত্তিক করার প্রচেষ্টা। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব দিয়েছে এবং এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে। এর উদ্দেশ্য শুধু আর্থিক সহায়তা প্রদান নয়; বরং দারিদ্র্য হ্রাস, বৈষম্য কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য প্রায় ১,৪৪,৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সরকারের কল্যাণমূলক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাংলাদেশও অনুভব করেছে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি শুধু একটি ভর্তুকি ব্যবস্থা নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার একটি নীতিগত উদ্যোগ।
যদি এই কর্মসূচি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে স্বচ্ছ ও ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে , এটি একদিকে যেমন পরিবারের ব্যয়ভার কমাচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে মূল্যস্ফীতির অভিঘাতও কিছুটা প্রশমিত করতে সহায়তা করছে। তবে এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভর করবে উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্যভান্ডারের নির্ভুলতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ওপর।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। শিল্পায়ন যতই এগোক না কেন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং কৃষকের আয়ের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অটুট থাকবে।
কৃষক কার্ড-ভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো প্রকৃত কৃষকদের কাছে ভর্তুকি, কৃষিঋণ, উন্নত বীজ, সার এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধা আরও দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়া। ডিজিটাল পরিচয়ভিত্তিক এই ধরনের ব্যবস্থা অপচয় কমাতে এবং নীতিগত সহায়তা সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশ এখন কৃষিকে কেবল একটি উৎপাদন খাত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কৃষিতে বিনিয়োগ মানে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করা।
একটি সমাজে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কেন্দ্র নয়; সামাজিক সম্প্রীতি, নৈতিক শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাজেটে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য স্বীকৃত ধর্মীয় নেতাদের জন্য ভাতা বা সহায়তা কর্মসূচির বিষয়টি এই সামাজিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে একটি নীতিগত বিষয় এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যেন সর্বদা ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এতে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
অনেকেই সামাজিক সুরক্ষা খাতকে শুধু ভাতা বা অনুদানের দৃষ্টিতে দেখেন। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। একজন দরিদ্র পরিবার যখন খাদ্য সহায়তা পায়, একজন কৃষক যখন সময়মতো প্রণোদনা পান, একজন প্রবীণ যখন নিয়মিত ভাতা পান বা একজন প্রতিবন্ধী যখন রাষ্ট্রীয় সহায়তা পান তখন শুধু তাঁদের জীবনমানই উন্নত হয় না; স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এই কারণেই উন্নত বিশ্বের বহু দেশ সামাজিক নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যদি দক্ষভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দারিদ্র্য হ্রাস, বৈষম্য কমানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এ কথাও সত্য যে, বরাদ্দ বৃদ্ধি কখনোই একমাত্র সাফল্যের মানদণ্ড নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক উপকারভোগীর কাছে সময়মতো সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর।
এই বাজেটের সামাজিক দর্শন আমাদের একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকও নিজেকে রাষ্ট্রের সুরক্ষার অংশ বলে অনুভব করেন। আর সেই কারণেই সামাজিক সুরক্ষা কোনো দয়া নয়; এটি একটি আধুনিক, দায়িত্বশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
একটি রাষ্ট্রের সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা, তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি হলো একটি শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতি। সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব পালন করে, কিন্তু সেই ব্যয়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে অর্থনীতির আয়তনও সমানভাবে বাড়াতে হয়। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক সংস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যে কোনো দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র তার ব্যাংকিং ব্যবস্থা। শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সবার জন্যই ব্যাংকিং খাত হলো মূল অর্থায়নের উৎস। কিন্তু একটি দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থনীতির গতিকে মন্থর করে দেয়।
বাংলাদেশে গত এক দশকে খেলাপি ঋণ, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, ঋণ পুনঃতফসিল এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ফলে আর্থিক খাতে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
আমার দৃষ্টিতে, বাজেটে ব্যাংকিং খাতকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সংস্কারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আইন প্রয়োগ, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা হলো সীমিত করভিত্তি। বাংলাদেশেও কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য সরকারের ওপর অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার চাপ তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, কর ফাঁকি রোধ, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়। একটি আধুনিক করব্যবস্থা শুধু রাজস্ব বাড়ায় না; এটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার সম্পর্কও গড়ে তোলে।
সরকারি ব্যয় অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য। দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল নীতিমালা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং দ্রুত প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা বিনিয়োগ বৃদ্ধির পূর্বশর্ত।
বাজেটে শিল্পায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিনিয়োগের পরিবেশ কেবল করছাড় বা প্রণোদনার ওপর নির্ভর করে না; আইনের শাসন, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং নীতির ধারাবাহিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশই ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প থেকে আসে। তাই এসএমই খাতের জন্য সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, বাজার সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপের জন্য সহায়ক নীতি গ্রহণ করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতির বহুমুখীকরণও ত্বরান্বিত হবে।
একটি বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি নতুন চাকরি সৃষ্টি না করে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে বড় দায়িত্ব। এই জনশক্তিকে দক্ষতায় রূপান্তর করতে হলে কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, শিল্প-শিক্ষা সমন্বয় এবং বাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি।
বাজেটে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার সফল বাস্তবায়নই আগামী কয়েক বছরে অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রপ্তানি। তৈরি পোশাক শিল্প এখনও প্রধান খাত হলেও দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, আইটি সেবা এবং হালকা প্রকৌশল খাতেও রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে হবে।
একই সঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ এই তিনটি ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থনৈতিক সংস্কার কখনোই সহজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে তা স্বল্পমেয়াদে কিছু চাপ তৈরি করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে সেই সংস্কারের সুফল জনগণই ভোগ করে।
আমার মূল্যায়নে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একটি সংস্কারমুখী অর্থনীতির ভিত্তি গড়ার চেষ্টা করেছে। তবে সেই প্রচেষ্টার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে। কারণ বাজেটের শক্তি কেবল তার অঙ্কে নয়; বরং নীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতায়।
একটি বাজেটের প্রকৃত শক্তি শুধু তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নয়; বরং আগামী এক বা দুই দশকের উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণে। উন্নত দেশগুলো তাদের বাজেটকে কেবল এক বছরের আর্থিক পরিকল্পনা হিসেবে দেখে না; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণের একটি কৌশলগত দলিল হিসেবে বিবেচনা করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি লক্ষ করা যায়।
অবকাঠামো উন্নয়ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। সড়ক, রেল, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং লজিস্টিক ব্যবস্থা যত উন্নত হবে, উৎপাদন ব্যয় তত কমবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ তত শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন সেই অবকাঠামোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করাই হবে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।
২০২৬ সালের বাজেটে যোগাযোগ, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক করিডোর উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এর সফল বাস্তবায়ন হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন সুযোগও সৃষ্টি হবে।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা অ্যানালিটিক্স, রোবোটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সেবা আগামী দশকের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র।
বাংলাদেশের জন্য এটি একই সঙ্গে একটি চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ।
যদি শিক্ষা, গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও উদ্ভাবনের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
বাজেটে ডিজিটাল অবকাঠামো, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্ভাবনকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এগুলো অর্থনীতি, কৃষি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই একটি আধুনিক বাজেটে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অপরিহার্য।
ভবিষ্যতের উন্নয়ন হবে সবুজ উন্নয়ন (Green Growth)। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে পরিবেশবান্ধব শিল্প, সৌরশক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই কৃষিতে আরও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন এবং তা বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দেখিয়েছে যে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ।বাংলাদেশের জন্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য সংরক্ষণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থিতিশীল করতে পারে।
বাংলাদেশ আজ এমন একটি ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।
চীন, ভারত, জাপান, আসিয়ানভুক্ত দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
অবকাঠামো উন্নয়ন, সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলো এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বার্থ, কৌশলগত ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
একটি জাতীয় বাজেটের প্রকৃত মূল্য কখনোই তার আকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় সেই বাজেট কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হলো, জনগণের জীবনে তার প্রভাব কতটা দৃশ্যমান হলো এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কতটা ভূমিকা রাখল তার ওপর।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় এটি কেবল রাজস্ব ও ব্যয়ের একটি হিসাব নয়; বরং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র নির্মাণের একটি নীতিগত রূপরেখা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামোকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা এই বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
তবে অর্থনীতির ইতিহাস আমাদের শেখায়, একটি ভালো বাজেটও বাস্তবায়নের দুর্বলতায় কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে। তাই এই বাজেটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। বরাদ্দ বৃদ্ধি অনেক সময় শিরোনাম হয়, কিন্তু সেই অর্থ যদি যথাসময়ে ব্যয় না হয় অথবা কাঙ্ক্ষিত খাতে সঠিকভাবে ব্যবহার না হয়, তাহলে বাজেটের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ তখনই কার্যকর হবে, যখন বিদ্যালয়ে শিক্ষকের ঘাটতি কমবে, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়বে এবং কারিগরি শিক্ষার মান উন্নত হবে।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ তখনই অর্থবহ হবে, যখন উপজেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত চিকিৎসাসেবার মান দৃশ্যমানভাবে উন্নত হবে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি তখনই সফল হবে, যখন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং ধর্মীয় নেতাদের জন্য নির্ধারিত সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে স্বচ্ছভাবে পৌঁছাবে।
বর্তমান বিশ্বে সফল রাষ্ট্রগুলো বাজেট বাস্তবায়নে প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং, ই-প্রকিউরমেন্ট, অনলাইন অডিট, উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার এবং নাগরিক পর্যবেক্ষণ দুর্নীতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশেও বাজেট বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল জবাবদিহি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শুধু প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন নীতির স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতাকে।
তাই বাজেটে ঘোষিত অর্থনৈতিক সংস্কারগুলোর পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশের কাঠামোগত উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়তে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং দক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
অর্থনীতি ও গণতন্ত্র পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক। শক্তিশালী সংসদ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা যত বাড়বে, কর প্রদানের সংস্কৃতি, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও তত শক্তিশালী হবে। তাই অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিও সমানভাবে জরুরি।
আমার মূল্যায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিক হলো- শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উচ্চ অগ্রাধিকার। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব। মানবসম্পদ উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের ওপর নীতিগত জোর। প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
একই সঙ্গে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক পদক্ষেপ না থাকলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার বিলম্বিত হলে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তৃতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও লক্ষ্যভিত্তিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা না গেলে বরাদ্দের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। চতুর্থত, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় বাজেট কোনো সরকারের রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অর্থনৈতিক নকশা। বাজেটের প্রতিটি বরাদ্দের পেছনে থাকে একটি রাজনৈতিক দর্শন, একটি উন্নয়ন কৌশল এবং একটি সামাজিক অঙ্গীকার।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সেই অর্থে কেবল একটি আর্থিক দলিল হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বিত অগ্রাধিকার এটিকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করে।
তবে ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বাজেটের ভাষণকে নয়, তার ফলাফলকে মূল্যায়ন করে। নতুন বিদ্যালয়, উন্নত হাসপাতাল, কর্মসংস্থান, কৃষকের ন্যায্য আয়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তার কার্যকারিতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানএসবই হবে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্যের সূচক।
বাংলাদেশ আজ এক নতুন অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। সামনে রয়েছে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে রয়েছে একটি তরুণ জনগোষ্ঠী, ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থান এবং উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা।
যদি এই বাজেটের ঘোষিত অঙ্গীকারগুলো দক্ষতা, সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু একটি অর্থবছরের বাজেট হিসেবেই নয়, বরং একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সক্ষম বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবেও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।
সংখ্যা পরিবর্তিত হয়, সময়ও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু যে বাজেট মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্নয়নের ভিত গড়ে দেয়সেই বাজেটই প্রকৃত অর্থে একটি জাতির ইতিহাস রচনা করে।
ডাঃ এ, কে, এম আহসান হাবীব নাফি
চিকিৎসক, রাজনৈতিক কর্মী
কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ, কমনওয়েলথ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন
