বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজকে আমরা সাধারণত একটি “এলিট” শ্রেণি হিসেবেই দেখি। সমাজের চোখে চিকিৎসক মানে সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠার প্রতীক। পরিবারগুলো সন্তানের ভবিষ্যৎ কল্পনা করে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়। ছোটবেলা থেকে একজন শিক্ষার্থীকে শেখানো হয় ভালো ফলাফলই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। ফলে চিকিৎসক হওয়ার পথে অধিকাংশ মানুষের জীবন ধীরে ধীরে একটি একমাত্রিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, যেখানে পড়াশোনাই একমাত্র পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রাপথে একটি জিনিস নিঃশব্দে জন্ম নেয় দাসত্বের মানসিকতা।
এই দাসত্ব কেবল প্রশাসনিক নয়, কেবল পেশাগত নয়; এটি ধীরে ধীরে একজন চিকিৎসকের মন, মস্তিষ্ক, আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করে। আর সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো চিকিৎসক সমাজের একটি বড় অংশ এই দাসত্বকে “স্বাভাবিক” হিসেবে মেনে নিতে শিখে গেছে।
একজন মানুষকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কেবল একাডেমিক সাফল্য যথেষ্ট নয়। খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক চর্চা, সংগঠন, সামাজিক কার্যক্রম এসব একজন মানুষকে আত্মমর্যাদা, নেতৃত্ব, প্রতিবাদ ও ব্যক্তিত্ব শেখায়। কিন্তু আমাদের চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থায় এসবের উপস্থিতি খুবই সীমিত। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ চিকিৎসকের বেড়ে ওঠা হয় এমন এক পরিবেশে, যেখানে “ভালো ছাত্র” হওয়াটাই শেষ পরিচয়। ফলে বাস্তব জীবনের ক্ষমতার রাজনীতি, আত্মসম্মানের প্রশ্ন কিংবা পেশাগত অধিকার নিয়ে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি অনেকের মধ্যেই গড়ে ওঠে না।
মেডিকেল কলেজে প্রবেশের পর এই দাসত্ব আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। শিক্ষককে সম্মান করা আর শিক্ষকের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য বা ভয় এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমবিবিএস জীবনে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষককে সম্মান করার চেয়ে “খুশি রাখা” বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ একজন শিক্ষকের হাতে তার পাস-ফেল, ক্যারিয়ার, পোস্টিং, সুযোগ অনেক কিছু নির্ভর করে। ফলে সম্পর্কটি অনেক সময় সুস্থ একাডেমিক সম্পর্কের সীমা ছাড়িয়ে ক্ষমতা ও আনুগত্যের সম্পর্কে রূপ নেয়।
এই সংস্কৃতি ইন্টার্নশিপ পেরিয়ে চাকরিজীবনেও অব্যাহত থাকে।
একজন সদ্য পাশ করা চিকিৎসক যখন কর্পোরেট হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে প্রবেশ করেন, তখন তিনি আরেক ধরনের দাসত্বের মুখোমুখি হন প্রশাসনিক দাসত্ব। সেখানে চিকিৎসকের পরিচয় একজন স্বাধীন পেশাজীবী হিসেবে নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে তিনি হয়ে যান “সার্ভিস প্রোভাইডার”, যাকে দিয়ে ব্যবসা পরিচালিত হবে। তার আত্মসম্মান, নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য বা পেশাগত মর্যাদার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থ।
আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেও এই বাস্তবতা দেখেছি। কর্পোরেট হাসপাতাল ব্যবস্থায় জুনিয়র মেডিকেল অফিসার থেকে শুরু করে অনেক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককেও প্রশাসনের অঘোষিত চাপ, ভয় ও আপসের সংস্কৃতির মধ্যে কাজ করতে হয়। ব্যতিক্রম হতে গেলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি থাকে, প্র্যাকটিস ব্যাহত হওয়ার ভয় থাকে, কিংবা নানাভাবে কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অধিকাংশ মানুষ চুপ থাকতে শেখে। ধীরে ধীরে আপসটাই “পেশাদারিত্ব” হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো চিকিৎসক সমাজের ভেতরেও এই দাসত্বকে অনেকে অস্বীকার করে। কারণ তারা নিজেদের “এলিট” ভাবতে অভ্যস্ত। সমাজও চিকিৎসকদের একটি বিশেষ শ্রেণি হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রশাসন, কর্পোরেট মালিকানা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো চাইলে খুব সহজেই একজন চিকিৎসককে অপমানিত, নিপীড়িত কিংবা অসহায় করে তুলতে পারে।
আজ একজন চিকিৎসক হাসপাতালে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি হন। কয়েকদিন আলোচনা হয়, প্রতিবাদ হয়, আইন চাওয়া হয়। তারপর সমাজ নতুন কোনো আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিছুদিন পর আবার আরেকজন চিকিৎসক আক্রান্ত হন। একই চক্র আবার শুরু হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসে না?
কারণ সমস্যাটি কেবল বাহ্যিক নয়; এটি মানসিকও।
আমরা চিকিৎসকরা অনেক সময় নিজেরাই নিজেদের মানবিক অস্তিত্ব ভুলে গেছি। আমরা ভুলে গেছি যে চিকিৎসকও একজন মানুষ; তারও আত্মসম্মান আছে, ভয় আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা এমন এক আত্মতুষ্টিতে ভুগি, যেখানে নিজেদের “এলিট”, “ফার্স্ট ক্লাস সিটিজেন” ভাবতে ভাবতেই বাস্তব অপমানকে স্বাভাবিক করে ফেলি। সমাজ আমাদের শিখিয়েছে “তুমি ভদ্র থাকবে”, “তুমি সহ্য করবে”, “তুমি প্রশ্ন করবে না”। ফলে এক গালে থাপ্পড় খেয়ে আরেক গাল এগিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতিই যেন পেশাদারিত্বের অংশ হয়ে গেছে।
আর ভয়াবহ সত্য হলো যদি কোনো চিকিৎসক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান, তবে অনেক সময় দোষটাও তার ঘাড়েই বর্তায়। প্রশাসনও তখন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষায় চিকিৎসকের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো তাকেই দায়ী করার পথ বেছে নেয়। এই বাস্তবতা চিকিৎসকদের আরও ভীত, আরও নীরব এবং আরও আপসকামী করে তোলে।
অথচ শ্রমজীবী মানুষেরা অনেক সময় আমাদের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ। একজন শ্রমিক আক্রান্ত হলে শত শ্রমিক একত্রিত হয়। কিন্তু চিকিৎসক সমাজের বড় অংশ এখনও ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং আত্মতুষ্টির দেয়ালের ভেতরে বন্দি।
যতদিন চিকিৎসক সমাজ নিজেদের “এলিট” ভাবার আত্মতুষ্টি থেকে বের হয়ে একজন মানুষ হিসেবে নিজেদের মর্যাদা ও অধিকারকে গুরুত্ব না দেবে, ততদিন কেবল আইন করে, বিবৃতি দিয়ে কিংবা সাময়িক প্রতিবাদ করে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
কারণ সমস্যার মূল কেবল বাইরে নয় সমস্যার একটি বড় অংশ আমাদের ভেতরেও।
যেদিন চিকিৎসক সমাজ বুঝতে শিখবে যে আত্মসম্মানবোধ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের অপরিহার্য অংশ; যেদিন তারা নিজেদের কেবল “সেবাদাস” নয়, একজন মর্যাদাবান পেশাজীবী ও মানুষ হিসেবে দেখতে শিখবে সেদিনই হয়তো পরিবর্তনের শুরু হবে।
তার আগে পর্যন্ত এই আত্মতুষ্ট সমাজে চিকিৎসকরা বারবার আক্রান্ত হবেন, অপমানিত হবেন, আর আমরা নতুন নতুন ঘটনার ভিড়ে পুরোনো ক্ষত ভুলে যেতে থাকব।
ডাঃ এ. কে. এম আহসান হাবীব নাফি
চিকিৎসক, রাজনৈতিক কর্মী
কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ, কমনওয়েলথ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন
ahsannafi71@gmail.com
