বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সবচেয়ে উর্বর সময় ’৯০- এ যিনিজিতেছিলেন, তিনি খালেদা জিয়া। আর শেষবার ২০০৮–এ তিনি যখন হারলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রেরই অন্ধকারযাত্রা শুরু হলো। এ এক অদ্ভুত সমীকরণ।
‘খালেদা জিতলে জিতে যায় গণতন্ত্র, খালেদা হারলে গণতন্ত্রও হেরে যায়’– এভাবে বললে হয়তো নাটুকে বা অত্যোক্তি লাগতে পারে। তবে সত্য হলো, যখন খালেদা জিয়া জিতেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রও তখন আলোচ্ছটা ছড়িয়েছে। আর যখন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সূর্যকে অস্তমিত করার সমস্ত ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছে, খালেদাকে পরাজিত করেই তাদের পরিকল্পনা সফল করতে হয়েছে। তিনি এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জীবনরেখা যেন নদীর দু’পারের মতো সমান্তরাল রেখায় চলেছে।
অনেকে তাকে বর্ণনা করতে গিয়ে “একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশনেত্রী” – এভাবে বলা শুরু করেন। এই জায়গায় কিছুটা দ্বিমতের অবকাশ আছে।
কেননা, খালেদা খানম পুতুল নামের ভদ্র মহিলা তরুণী বয়সেই একজন আর্মি অফিসারের স্ত্রী হয়েছিলেন। এরপর থেকে পাক-ভারত যুদ্ধ, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন, স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমরনায়ক, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান, সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট– স্বামীর জীবনের প্রতিটি ধাপে খালেদাকে নিজের একটা লড়াই লড়তে হয়েছে। ফলে তার মানসিক গড়ন অবশ্যই ‘সাধারণ গৃহবধূ’র মতো ছিল না।
তবে হ্যাঁ, তিনি কোনোদিন জিয়াউর রহমানের সেনাবাহিনী কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে মন্তব্য করেছেন, তদবির, সুপারিশ বা পরামর্শ দিয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন – এমনটা শোনা যায় না। রাজনীতির সক্রিয় অভিজ্ঞতায় তিনি নবীন ছিলেন। কিন্তু বৃহত্তর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য যে মানসিক প্রস্তুতি, সেটা তার ছিল।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছিলেন সেনাশাসন দিয়ে। কিন্তু বিদায় নিয়েছেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে। তিনি সেই বিরল সেনাশাসক, যার নাম ও দল, দেশের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে নন্দিত ও বিপুল সমর্থন লাভ করে টিকে আছে।
জিয়াউর রহমান বিএনপির পাটাতন তৈরী করে দিয়ে গেছেন। তিনি উন্নতমানের বীজ থেকে বপিত একটি চারাগাছ রোপণ করেছিলেন। খালেদা জিয়া সেটাকে সার-পানি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাছে পরিণত করেন। জিয়াউর রহমান সবকিছু প্রস্তুত করে একটা কাঠামো বানিয়েছেন, দলের আকৃতি দিয়েছেন। খালেদা জিয়া তার পরিচর্যা করে পূর্ণাংগ রূপ দিয়েছেন। তিনি শুরু করেছেন বিরোধী অবস্থানে থেকে। একটা রাজনৈতিক দলের সাবালকত্ব, তথা রাজপথের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনাটা বিএনপির ক্ষেত্রে ঘটেছে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।
খালেদা জিয়া সরলরৈখিক চিন্তা করেছেন। সেই সরলরেখা ছিল দেশের চিন্তা, আত্মমর্যাদার প্রশ্ন আর গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রথম পরীক্ষা তথা ১৯৮৬-তে এরশাদের সাজানো নির্বাচনে আ. লীগ ও জামায়াত গেলেও তিনি যাননি। সুযোগসন্ধানী হাসিনা ভেবেছে, খালেদা জিয়া বুঝি মাইনাস হয়ে গেছেন। কিন্তু দেখা গেল তিনি যাননি বলে, সেই নির্বাচন আর বৈধতাই পায়নি। আ.লীগ-জামায়াতের অংশগ্রহণ বৈধতা তৈরী করতে পারেনি, কিন্তু তিনি গেলে ঠিকই সেটা হতো। খালেদা জিয়ার সেই আপসহীনতাকে দেশের মানুষ মূল্যায়ন করেছে, প্রথম সুযোগেই তাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে।
তার পুরো রাজনৈতিক জীবন তৈরী হয়েছে একমাত্র জনগণের সমর্থনের উপর ভর করে। ফলে তার কোনো বৈদেশিক মিত্র নাই। দাতা নাই। দেশেও জনগণভিন্ন তার কোনো শক্তি নাই।
তিনি তার বক্তব্য-বিবৃতিতে যা যা বলেছেন, শুনবার সময় গুরুত্ব বোঝা না গেলেও আজকের দিনে এসে প্রমাণিত হয়েছে – তার প্রতিটি কথাই তিনি মিন করে বলেছেন, প্রতিটি কথাই তিনি আক্ষরিক অর্থেবুঝিয়েছেন।
তার “ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আর আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা”– আজকে ব্যাখ্যাতীতভাবে প্রমাণিত।
২০০৮ এ তিনি বলেছিলেন, “দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও”। প্রকৃত অর্থেই তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, দেশ বিক্রির আয়োজন চলছিল; এদেশের মানুষের নাগরিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার ফন্দি-ফিকির হচ্ছিল।
তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগকে তিনি পঁচার সময় দিচ্ছেন, যেন পঁচে-গলে দুর্গন্ধ বের হয়। সেটাই হয়েছে অবশেষে।
তিনি বলেছিলেন, এদেশ ছেড়ে কোথাও যাবেন না। তিনি সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। এমনকি শেষবার যখন লন্ডনে গেলেন চিকিৎসা করতে, তিনি পরিবারের কাছে না থেকে এ দেশেই ফিরে এলেন।
বিএনপির কর্মীরা তার নামটাকেই স্লোগানে পরিণত করেছে। ‘খালেদা’ – ‘জিয়া’, ‘জিয়া’ – ‘খালেদা’। কারণ চরমতম দুঃসময়, নির্যাতন-নিষ্পেষণে তিনি-ই ছিলেন লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। তার নাম শক্তি যুগিয়েছে, তার নাম সাহস দিয়েছে।
আজকে খালেদা জিয়া সংকটাপন্ন অবস্থায় উপনীত। সারাজীবন আপস না করা, দেশের স্বার্থকে কখনো বিক্রি না করে দেওয়া এবং একমাত্র জনগণের উপর ভরসা রাখার প্রতিদানস্বরূপ তিনি আজ সর্বত্র সম্মানিত হচ্ছেন। বস্তুত, খালেদা জিয়াই বিএনপি। বিএনপি-ই খালেদা জিয়া। একমাত্র বিএনপি ক্ষমতায় আসলেই খালেদা জিয়াকে কোনো রাষ্ট্রীয় পদে দেখা যেতে পারে। তারপরেও, বিএনপিবিরোধী বর্তমান অক্ষ থেকে চেষ্টা আছে বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে পৃথক করে দেখানোর।
এতে বিএনপির কিছু ক্ষতি হচ্ছে বলে তারা মনে করেন। কিন্তু একইসাথে সেটা খালেদা জিয়াকেও সার্বজনীন করে তোলে। মাঝেমাঝে মনে হয়, বিএনপি ও খালেদা জিয়া তো পৃথক কোনো সত্ত্বা না। কিন্তু পরক্ষণেই খেয়াল আসে, যে ত্যাগ ও সংগ্রাম তিনি করেছেন দেশের গণতন্ত্রের জন্য, দেশের মানুষের নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য, তিনি আসলে দলীয় বৃত্তের বাইরে সবার শ্রদ্ধার আসনে ওঠা ডিজার্ভই করেন। এতে আর বিএনপির পক্ষ থেকে পিছুটান রাখার দরকার নাই। জীবন সায়াহ্নে ব্যক্তি খালেদা এই সম্মানটা পেতেই পারেন।
আজকে খালেদা জিয়াকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা, এসএসএফ-পিজিআরের নিরাপত্তা বলয়, তিন বাহিনীর প্রধান, সরকারের প্রধান নির্বাহীর তাকে দেখতে আসা– সবই অর্নামেন্টাল। কোনোটাই তার মর্যাদার ক্ষয়-বৃদ্ধি করে না। মানুষের মনে তার যে স্থান, তা ইতোমধ্যে ইতিহাস ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু মর্যাদারও যে প্রকাশ, তা দৃশ্যমান হওয়াটা লক্ষণীয়।
খালেদা জিয়া জীবিত থাকতেই নিজেকে যেমন কালোত্তীর্ণ করে ফেলেছেন, একইসাথে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দিশাও বাতলে দিয়েছেন– সেটা হচ্ছে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মাধ্যমে মানুষের নাগরিক মর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একটি সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা। সে পথেই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
আবদুর রাজ্জাক আল মাসুম
চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী
