ঝিনাইদহের মহেশপুরে দিনে কোটি টাকার ড্রাগন বিক্রি

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুর বাজার। বছর পাঁচেক আগেও এই বাজার ছিল কেবল এক প্রান্তিক বাজার। তবে ড্রাগন ফলের জমজমাট বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে গৌরীনাথপুর বাজার এখন যেন ড্রাগন ফলের রাজধানী। এই ফলের বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে গৌরীনাথপুর বাজারে গড়ে উঠেছে শতাধিক পাইকারি আড়ত। এসব আড়ত থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে সুস্বাদু ড্রাগন ফল। এই বাজারে দিনে গড়ে এক থেকে দেড় কোটি টাকার ড্রাগন ফল বেচাকেনা হয়। আড়ত গড়ে ওঠার ফলে স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে গৌরীনাথপুর বাজার ঘিরে।

জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলাজুড়ে বিদেশি ড্রাগন ফলের ব্যাপক চাষাবাদ শুরু হয়েছে। দিন দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই ফলের চাহিদাও বাড়ছে।

সরেজমিনে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফল গৌরীনাথপুর বাজারে নিয়ে আসেন। বাজারজুড়ে লাল, গোলাপি ও হলুদ রঙের ড্রাগন ফলের স্তূপ। বাজারের আড়তগুলোতে চলে বেচাকেনা। আড়তের চালার নিচে সাজিয়ে রাখা হয় লাল টুকটুকে ড্রাগন ফল। আড়তগুলোতে চলছে বাছাই, ওজন ও প্যাকেটজাত করার ব্যস্ততা। পুরো বাজার জুড়ে প্রতিদিন প্রায় একই চিত্র দেখা যায় বলে জানিয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ী ও কৃষকরা। দিনভর চলে ক্রেতা বিক্রেতাদের দাম দর হাঁকা ও হাকডাক। এরপর দেশের বিভিন্ন জেলায় ট্রাকযোগে পাঠানো হচ্ছে এসব ফল।

ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে বাজারে প্রায় ১০০টি আড়তে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ড্রাগন ফল কেনাবেচা হচ্ছে। এখান থেকে ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফল সরবরাহ করা হয়।

স্থানীয় কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, পাঁচ বিঘা জমিতে ড্রাগনের আবাদ করেছি। জমি থেকে ফল তুলে সহজেই আমরা এই বাজারে ফল বিক্রি করতে পারি। এতে পরিবহন খরচ ও ফল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমেছে। ব্যাটারিচালিত ভ্যান, বাইসাইকেল ও বস্তায় ভরে ফল নিয়ে আমরা বাজারে এসে বিক্রি করি।

আড়তদার সাইদুর রহমান বলেন, মৌসুমের সময় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ড্রাগন ফল বাজারে আসে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এখানে এসে সরাসরি ফল কিনে নিয়ে যান। কৃষকও ভালো দাম পান, আমরাও ব্যবসা করতে পারছি।

বাজারের পাইকারি ও খুচরা আড়তদার সাঈদ সরকার বলেন, বাইরের জেলার ব্যবসায়ীরা এখানে সাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করতে পারেন। এই বাজারে প্রতিদিন গড়ে ১ থেকে দেড় কোটি টাকার ড্রাগন ফল বেচাকেনা হয়। এসব ফল সরবরাহ করা হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরে। ফলের আকার ও মান ভেদে দাম কমবেশি হয়ে থাকে।

বাজারের একটি আড়তে হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত জাকির হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, এই বাজার গড়ে ওঠায় অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি আড়তে কাজ করে মাসে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা বেতন পাই। এ ছাড়া আড়তগুলোতে ফলের পরিমাপ করা ও প্যাকেজিং করার জন্য আলাদা আলাদা লোক কাজ করে। সবাই প্রতি মাসে গড়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতে পারে।

নাটোর থেকে আসা পাইকারি ফল ব্যবসায়ী আব্দুস সামাদ বলেন, এই বাজারে আমার মতো অনেকেই ফল কিনতে আসেন। বাজারে ব্যবসার পরিবেশ ও নিরাপত্তাও সন্তোষজনক। বিভিন্ন এলাকায় ড্রাগন ফল পাওয়া গেলেও গৌরীনাথপুর বাজারের ফলের মান ভালো। দামও নাগালে। প্রতি সপ্তাহে এই বাজারে এসে ফল কিনে ট্রেনে করে নাটোরে ফিরে যাই।

এ ব্যাপারে মহেশপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, ড্রাগন ফলের নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করতে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিকের অপব্যবহার যেন না হয়, সে বিষয়ে আমরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছি। পাশাপাশি গৌরীনাথপুর বাজারের সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেও কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪/২৫ মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ হাজার ১২৯ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফলের আবাদ হয়েছে। জেলার ৬টি উপজেলায় ড্রাগন ফলের উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ১৮২ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, জেলার সদর উপজেলায় ২৫ হেক্টর, কোটচাঁদপুরে ৪৩৯ হেক্টর, মহেশপুরে ৩১৬ হেক্টর, কালীগঞ্জে ৩২৮ হেক্টর, হরিণাকুণ্ডুতে ৬ হেক্টর ও শৈলকুপা উপজেলায় ১৫ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফলের আবাদ করেছেন কৃষকরা।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন