কুমিল্লা নগরী থেকে ২১ কিলোমিটার উত্তরে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা। সীমান্তবর্তী এ উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ৮৪টি গ্রামের প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫০টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৫৩টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
এ ছাড়াও কর্মরত ৯ জন চিকিৎসকও প্রেষণে (সংযুক্তি) কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ বা কুমিল্লা সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। জনবল সংকটের কারণে আগত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় এখানে মেজর ও মাইনর কোনো ধরনের অস্ত্রোপচারই করা সম্ভব হচ্ছে না। গাইনি সার্জন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটে প্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে গাইনি-সংক্রান্ত জটিলতায় আসা রোগীরাও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এছাড়া শিশু বিশেষজ্ঞ না থাকায় জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদেরও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নেই নাক-কান-গলা ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞও। সহকারী সার্জন, মেডিকেল অফিসার পদেও ঘাটতি রয়েছে। মিডওয়াইফের সব পদ শূন্য থাকায় স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত সেবা শতভাগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ না থাকায় নার্সরা আপাতত এ দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়াও নার্স, সিনিয়র স্টাফ নার্স, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর অনেক পদ শূন্য রয়েছে। হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ানের একটি পদ ও এক্স-রে বিভাগের রেডিওগ্রাফারের পদও শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে, জরুরি রোগীদের জেলা শহরে স্থানান্তরের জন্য অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও নেই চালক। ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে ভোগান্তি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কুমিল্লা-মিরপুর সড়কের অনেক স্থান ভাঙাচোরা হওয়ায় এ উপজেলা থেকে জেলা শহরে যোগাযোগ বা যাতায়াত ব্যবস্থা নাজুক। ফলে অনেক সাধারণ মানুষের পক্ষে জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া অনেকটা কঠিন ও ভোগান্তির। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্থানীয় সরকারি হাসপাতালটিই চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়স্থল। কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় তাদের পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এসেছেন উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের নাল্লা গ্রামের বাসিন্দা ফারুক মিয়া (৩৭)। তিনি বলেন, যে কোনো অসুখ-বিসুখে এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে আসি। আমাদের মতো গরীব মানুষের শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সাধ্য নেই। শিশু বিশেষজ্ঞের কথা জানতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছেন নাই। এরকম অনেক ডাক্তারই নেই। আমরা চাই, এখানেই ভালো চিকিৎসা এবং প্রায় সব ধরনের ডাক্তার থাকুক।’
একই ধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন উপজেলার শিদলাই ইউনিয়নের শিদলাই গ্রাম থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী সানজিদা আক্তার। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগেও দেখেছি সার্জারি বিশেষজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু আজকে এক প্রয়োজনে এসে জানতে পারলাম তিনি বদলি হয়ে গেছেন। শহরে গিয়ে সময় ও অর্থ ব্যয় করা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আমরা চাই উপজেলায় অন্তত ছোটখাটো অপারেশনগুলো হোক, এতে আমাদের মতো মধ্যবিত্তের ভোগান্তি লাঘব হবে, চিকিৎসা ব্যয় সাশ্রয় হবে।’
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শেখ হাসিবুর রেজা কালবেলাকে বলেন, ‘জনবল সংকট রয়েছে। হাসপাতালে ১৫০টি পদের মধ্যে ৫৩টি পদই শূন্য। সীমিত জনবল নিয়ে সেবাকার্যক্রম পরিচালনা করতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিষয়টি লিখিতভাবে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে জানানো হয়েছে। আশা করছি শিগগির শূন্য পদগুলো পূরণ হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবু আমরা সীমিত জনবল নিয়েই সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে সেবাকার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’
