নেই জমিদার। সংরক্ষণের অভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে জমিদারবাড়ির নানা স্থাপনার চিহ্ন। কিন্তু বিভিন্ন লোকগাথা নিয়ে টিকে আছে এর রহস্যঘেরা দিঘি। যে দীঘির জলে ভেসে বেড়াত ‘সোনার চালুনি’ ও ‘কালো পাথর’। ভেসে উঠত সোনা-রূপার নানা তৈজসপত্র। বলছি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিরব স্বাক্ষী রাজবাড়ি খ্যাত ‘বামনডাঙ্গা জমিদারবাড়ি’র কথা।
ঐতিহাসিক এই জমিদারবাড়ির অবস্থান গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম সর্বানন্দে। যে বাড়িতে জমিদারের বসবাসের জন্য ছিল বাসগৃহ, ছিল অতিথিদের জন্য অতিথিশালা, রাজকার্য পরিচালনার জন্য রাজদরবার, ধর্মচর্চার জন্য দুর্গামন্দির। এছাড়া ছিল পিরামিডসদৃশ তিনটি মঠ, খাজনা আদায়ে ট্রেজারি, গাভী রাখার গোশালা ও হাতি রাখার জন্য হাতিশালা। আর এসব স্থাপনা তৈরি হয়েছিল ইট, সুরকি ও লোহা দ্বারা। যদিও বাসগৃহ, অতিথিশালা, রাজদরবার, দুর্গামন্দির, মঠ, ট্রেজারিসহ অন্য নিদর্শনগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক আগে, তবে সর্বশেষ ২০১০ সালে ভেঙে ফেলা হয় হাতিশালাটিও। এর মধ্য দিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ঐতিহাসিক বামনডাঙ্গা জমিদারবাড়ির শেষ চিহ্ন।
এখন ঐতিহাসিক এই জমিদারবাড়িতে রয়েছে তিনটি দীঘি। তবে উত্তর পাশে থাকা দিঘিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে ‘সোনার চালুনি, কাল পাথর ও বাসনকোসন’ ভেসে ওঠার মতো জনপ্রিয় নানা লোকগাথা। শোনা যায়, জমিদারবাড়ির উত্তর পাশে থাকা দিঘির জলে সারারাত ভেসে থাকত ‘সোনার চালুনি’।
আরেকটিতে ভেসে থাকত ‘কালো পাথর’। এসব ভাসলে কালো হয়ে যেত দিঘির জল। ভয়ে দিঘিতে নামার সাহস পেতেন না অনেকে। কথিত রয়েছে-
একসময় গ্রামের সাধারণ মানুষের বাড়িতে বিয়ে কিংবা বড় কোনো অনুষ্ঠান হলে রান্নার বড় পাতিল ও থালা-বাসনের প্রয়োজন হতো। আয়োজক ওই দীঘির পাড়ে এসে মনে মনে কিংবা বিড়বিড় করে এসব তৈজসপত্রের কথা জানাতেন। আর তখন দিঘির জলের ওপর ভেসে উঠত ‘সোনার বা রুপার বাসনকোসন ও রান্নার বড় পাতিল’। কাজ শেষে আবার দিঘিতে ফেরত দিতেন সেগুলো।
কিন্তু কোনো এক লোভী মানুষ অনুষ্ঠানের জন্য দিঘি থেকে নেওয়া তৈজসপত্র ব্যবহারের পর আর ফেরত দেননি। তারপর পর থেকে দীঘিটি হারিয়ে ফেলে তার অলৌকিক ক্ষমতা। বন্ধ হয়ে যায় বাসন ভেসে ওঠার মতো ঘটনা।
জমিদারদের সঙ্গে মিশতেন এমন শতবর্ষী এক প্রবীণ স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেন, ‘জমিদার শরৎ রায় চৌধুরী, তার মেয়ে জমিদার সুমতি বালা চৌধুরী (সুনীতি), জমিদার বিপিন রায় চৌধুরী এবং তার দুই ছেলে জমিদার মনীন্দ্র রায় চৌধুরী ও জমিদার জগৎ রায় চৌধুরী সবার জমিদারি আমি দেখেছি। তারা হিন্দু হলেও আমাকে খুব স্নেহ করতেন। ভালোবাসতেন প্রজাদেরও’।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পাথর ভেসে ওঠা দেখেছি। কিন্তু কালক্রমে দিঘির জল অপবিত্র হয়ে যাওয়ায় এখন আর ভাসে না’।
যদিও প্রচলিত এই লোকগাথার ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই। তবুও ‘বামনডাঙ্গা জমিদারবাড়ির দিঘি’ নিয়ে প্রচলিত এসব গল্প আশ-পাশের মানুষকে শত বছর ধরে করে রেখেছে রহস্যময়।
