ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে ভাঙা ইটের দেয়াল। কোথাও পুরানো ইটের গাঁথুনি, কোথাও লতাপাতা ও ফুলের কারুকাজের চিহ্ন। মাথার ওপর নেই ছাদ, নেই গম্বুজের পূর্ণ অবয়ব। মসজিদের ভেতর জন্ম নেওয়া বড় গাছের শিকড় আঁকড়ে ধরেছে প্রাচীন দেয়াল। বহু বছর ধরে সেখানে শোনা যায় না আজানের ধ্বনি। নাটোরের বাগাতিপাড়ায় পাকা ইউনিয়নের চকমাহাপুর গ্রামের এই নীরব স্থাপনাই স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘আবদালের মসজিদ’ নামে।
প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই মসজিদটি দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ে আজ বিলুপ্তপ্রায় এক ঐতিহাসিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে।
লোকমুখে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, পদ্মার শাখা বড়াল নদ থেকে উৎপন্ন একটি নদী একসময় এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। নদীটি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিরও অন্যতম ভিত্তি ছিল। সে সময় নদীতে প্রচুর ঝিনুক ও শামুক পাওয়া যেত। সেগুলো পুড়িয়ে তৈরি করা হতো চুন। তৎকালীন দালানকোঠার গাঁথুনি, প্লাস্টার ও অলংকরণে চুন ছিল গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রী। এই চুন উৎপাদনকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে একটি বিশেষ পেশাভিত্তিক মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবদাল সম্প্রদায়।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতন স্থানীয়দের মতে, ‘আবদালের মসজিদ’ শুধু একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাগাতিপাড়ার নদীকেন্দ্রিক জনপদ, ঝিনুক-শামুক থেকে চুন তৈরির প্রাচীন শিল্প, স্থানীয় অর্থনীতি এবং প্রায় হারিয়ে যাওয়া আবদাল সম্প্রদায়ের জীবন ও পেশার ইতিহাস। যথাযথ গবেষণা, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও সংরক্ষণ করা গেলে আবদালের মসজিদ বাগাতিপাড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে নতুন পরিচিতি পেতে পারে।
অন্যথায় কয়েক শতকের ইতিহাস বহনকারী এই স্থাপনাটির অবশিষ্ট দেয়ালগুলোও একদিন মাটিতে মিশে যেতে পারে। তখন আবদাল সম্প্রদায়, তাদের চুনশিল্প এবং এই মসজিদের ইতিহাস হয়তো শুধু স্থানীয় মানুষর মুখ মুখে প্রচলিত লোককথা হিসেবেই টিকে থাকবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চকমাহাপুর থেকে বাঘা, আড়ানী যাওয়ার পথে মূল সড়কের ডান পাশে একটি সরু ডাল রাস্তা। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে প্রায় ২০০ গজ এগোলেই জঙ্গলের আড়ালে চোখে পড়ে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ। প্রায় ১৯ শতক জমির উঁচু ভিটার একটি অংশে এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপনাটির অবশিষ্ট দেয়াল। মসজিদের চারপাশে খেজুর, ভেন্না ও নানা ধরনের ঝোপঝাড়ে জায়গাটি প্রায় ঢেকে গেছে। মানুষের চলাচলও খুব কম।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় মসজিদের আশপাশে আরও অনেক পুরোনো স্থাপনা ও ইট ছড়িয়ে ছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। জমির মালিকরা অনত্র সরিয়ে নিয়ে গেছে। আবার বিভিন্ন সময় স্থানীয় লোকজন নিয়ে গেছেন বলেও এমন অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বর্তমানে পাশের একটি নতুন মসজিদের প্রাচীর নির্মাণেও পুরোনো ইট ব্যবহার করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
বর্তমানে মসজিদের আশপাশের জমিগুলো যারা ভোগদখল করছেন আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় সময় এসব জমি তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে হস্তান্তর করে গিয়েছিলেন। কালের পরিক্রমায় নদীটি ভরাট হয়ে গেলে ঝিনুক ও শামুকের প্রাপ্যতা কমে যায়। একসময় বন্ধ হয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী চুন উৎপাদনের কাজ। জীবিকার তাগিদে আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্ন পেশায় ছড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান। তাদের চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে তাদের নির্মিত এই মসজিদটিও।
স্থানীয়রা জানান, সাপ-পোকামাকড়ের ভয়ে অনেকেই এখন সেখানে যেতে চান না। মসজিদের অবশিষ্ট স্থাপনাটি আনুমানিক ১০ ফুট লম্বা ও ১২ ফুট প্রস্থের। মাটি থেকে দেয়ালগুলোর বর্তমান উচ্চতা প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট। দেয়ালগুলোর পুরুত্ব আনুমানিক দেড় ফুট। ছোট ছোট পুরানো ইট ও সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত দেয়ালগুলো এখনো অতীতের নির্মাণশৈলীর সাক্ষ্য বহন করছে। মসজিদের দরজাগুলোও স্থাপনাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দরজাগুলো অনেকটা ইংরেজি ইউ আকৃতির। দরজার গাঁথুনি আনুমানিক দুই ফুট পুরু। প্রতিটি দরজার ভেতরে প্রায় চার ফুট ফাঁকা জায়গা রয়েছে, যেখান দিয়ে প্রবেশ করা যায়। দরজার গাঁথুনিতে পুরোনো আমলের ইটের প্রায় পাঁচটি করে স্তর বা সারির চিহ্নও দেখা যায় মসজিদের পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালে এখনো লতাপাতা ও ফুলের হাতের কাজের মতো প্রাচীন কারুকাজের চিহ্ন রয়েছে।
প্রাচীন নকশায় নির্মিত প্রায় পাঁচটি দরজার চিহ্নও দেখা যায়। আর দেওয়ালের গায়ে দুই একটি নকশা এখনও বিদ্যমান। এসব নির্মাণশৈলীতে তৎকালীন সময়ের কারিগরি দক্ষতার ছাপ স্পষ্ট। মসজিদের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে একটি বড় গাছ। এর শিকড় ধীরে ধীরে দেয়ালের গাঁথুনির ভেতরে ঢুকে স্থাপনাটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দীর্ঘদিন ছাদহীন অবস্থায় পড়ে থাকায় বৃষ্টি, রোদ ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের প্রভাবও স্পষ্ট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সরকারি বা প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে জঙ্গল ও গাছের শিকড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেয়াল। হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো ইট ও স্থাপনার অংশ।
তাদের দাবি, প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত মসজিদটির জরিপ ও গবেষণা করা হোক। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ভিটার সীমানা নির্ধারণ, জঙ্গল পরিষ্কার এবং প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এই মসজিদের অতীত।
বর্তমান ভোগদখলকারী পরিবারের একজন সদস্য মোস্তাক মণ্ডল জানান, একসময় ওই এলাকায় আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করতেন। তাদের কাছ থেকেই তার পূর্বপুরুষেরা এই সম্পত্তির মালিকানা পান। প্রায় ১৯ শতক জমির ওপরের পুরানো ভিটাতেই আবদালের মসজিদটি রয়েছে। একসময় মসজিদের আশপাশে কয়েকটি বাড়িঘর থাকলেও সেগুলো পরে ভেঙে ফেলা হয়েছে।আর কিছু স্থাপনা মাটির নিচে দেবে গেছে।
তিনি আরও জানান, পুরানো মসজিদটি এখন তাদের কাছে আবেগ ও পূর্বপুরুষদের স্মৃতির অংশ। সরকার যদি মসজিদটি সংস্কার করে কিংবা ঐতিহাসিক পুরোনো স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়, তাতে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় পুরো জায়গাটি আশপাশের সমতল ভূমি থেকে অনেক উঁচু একটি ভিটা ছিল। কিছু স্থাপনা মাটির নিচে দেবে যাওয়ার কথা ও মসজিদটির পাশে আবদাল সম্প্রদায়ের বসত ভিটার আবস্থানের কথা জানা যায়।পরে আশপাশে চাষাবাদের জন্য জমি কেটে চাষের জন্য প্রস্তুত করা হয়।যার কারণে ঐতিহাসিক ভিটার উচ্চতাও আগের তুলনায় অনেকটা নিচু হয়ে যায়।
স্থানীয় প্রবীণ আলহাজ তছির উদ্দিন বলেন, তার বয়স প্রায় ১০০ এর কছাকাছি। ছোটবেলা থেকেই এই ভিটাটাকে এমনভাবেই দেখে আসছেন তিনি। তাদের বাপ দাদার সময়ের আগে থেকে এই আবদালের মসজিদটির এ খানে অবস্থিত বলে তিনি জানেন। প্রায় ৩শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এ মসজিদ ওই স্থানে আছে।আগে মসজিদটির চারপাশে আরও অনেক পুরোনো স্থাপনা ও ইটের প্রাচীর ছিল।পরে মানুষ সেগুলো নিয়ে গেছে। এখন শুধু এই দেয়ালগুলোই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নাজিম উদ্দিন বলেন, এই স্থাপনাটি এক সময় আরও অনেক উঁচু ছিল। চাষবাসের কারণে আস্তে আস্তে এটি নিচু হয়ে গেছে।জঙ্গলের কারণে যে এখন কেউ সহজে ভেতরে ঢোকে না। বিশেষ করে সাপ, পোকামাকড়ের ভয়ে মানুষ এড়িয়ে চলে।অথচ এই জায়গাটা আমাদের গ্রামের বহু পুরোনো ইতিহাস বহন করছে।
বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণাকারী অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ বছর আগে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর (প্রায় ১৭০৪-১৭২৭) শাসনামলে চকমাহাপুর গ্রামের নদীতীরে আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন এই মসজিদ নির্মাণ করেন।
আজিজুর রহমানের মতে, সে সময় চুনশিল্প ছিল এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সেই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরাই ধর্মীয় প্রয়োজন মেটাতে মসজিদটি নির্মাণ করেন। স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণকৌশলের দিক থেকেও এটি তৎকালীন গ্রামীণ স্থাপত্যের একটি ব্যতিক্রমী নিদর্শন ছিল। পরে স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘আবদালের মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়।
পাকা ইউনিয়ন পরিষদের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, আবদালের মসজিদটি আমাদের এলাকার একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা।বিষয়টি নিয়ে ইউএনও মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলব। অন্তত জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করব। স্থানীয় মানুষকেও এ ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতন হতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুল ইসলাম বলেন, আবদালের মসজিদটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
