নতুন শিক্ষাবর্ষের সরকারি পাঠ্যবই ছাপাকে ঘিরে অনিয়ম ও দরপত্রে সমঝোতার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে প্রেস মালিকদের একটি অংশের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। এতে সরকারের প্রায় ২০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত বছর কালো তালিকাভুক্ত হওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এবার বই ছাপার কাজ পেয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) তথ্যমতে, এবার প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুলসংখ্যক বই ছাপা হচ্ছে। এসব বই ছাপার কাজে প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে ৫২টি এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ১১৫টি ছাপাখানা যুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, বই ছাপার দরপত্রে আগে থেকেই সমঝোতার চেষ্টা ছিল। ৭০০টির বেশি দরপত্রের মধ্যে ৪৮৫টি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৩১টি দরপত্রে একজন করে দরদাতা ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে একই মালিকের একাধিক প্রতিষ্ঠান একই দরপত্রে অংশ নেয়। আবার বেশিরভাগ দরপত্রে দর ছিল কাছাকাছি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রাক্কলিত দর ফাঁসের সুযোগ নিয়ে একটি চক্র এভাবে কাজ ভাগ করে নেয়।
এদিকে বইয়ের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্ধারিত ৮০ গ্রাম পুরুত্বের কাগজের পরিবর্তে অনেক প্রেসে ৭০ থেকে ৭৫ গ্রামের কাগজ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কালি ও বাঁধাইয়ের মান নিয়েও অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে। তদারকিতে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দাবি, কিছু প্রেসে নিম্নমানের বই স্তূপের ভেতরে রেখে বাইরে ভালো বই সাজিয়ে রাখা হচ্ছে।
নিম্নমানের কাগজে বই ছাপা, ছাপা ও বাঁধাইয়ে অনিয়ম এবং সময়মতো কাজ শুরু না করায় ইতোমধ্যে ১৪টি ছাপাখানাকে শোকজ করেছে এনসিটিবি। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার শোকজ করা হয়েছে।
মনিটরিং কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৪টি ছাপাখানায় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৫টি ফর্মা, ১১ হাজার ৭৪৭টি বই এবং ৩১ হাজার ৭২০টি বইয়ের প্রচ্ছদ নষ্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে দোয়েল প্রিন্টার্সে সবচেয়ে বেশি ৬৭ হাজার ৭০০টি ফর্মা নষ্ট হয়েছে। এছাড়া এম/এস রেজা প্রিন্টার্সে ৪৫ হাজার এবং রেদোয়ানিয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সে ৪৪ হাজার ফর্মা নষ্ট করার তথ্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গত বছর কালো তালিকাভুক্ত হওয়া কিছু প্রতিষ্ঠান এবারও বই ছাপার কাজ পেয়েছে। একইভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান বারবার অনিয়ম করেছে, তাদের কয়েকটি এবারও কাজ পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) প্রতিষ্ঠান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। এনসিটিবি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বইয়ের পিডিআই ও পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশনের জন্য দুটি করে প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে। এর মধ্যে ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন বিডি প্রাথমিকের এবং ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে রয়েছে।
ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির বিরুদ্ধে প্রেস মালিকদের সঙ্গে আঁতাত করে নিম্নমানের বইয়ের অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অতীতেও অনিয়মের অভিযোগ থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি সঠিকভাবে কাজ করছেন।
এদিকে প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ এগিয়ে গেলেও মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক পর্যায়ের বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে ৪৩ শতাংশ, বাঁধাই ৩৯ শতাংশ এবং পিডিআই ২১ শতাংশ।
অন্যদিকে মাধ্যমিকের ২২ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৫৯২ কপি বইয়ের মধ্যে ছাপার কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। বাঁধাই শেষ হয়েছে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং পিডিআই হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব বই ছাপা ও সরবরাহ করা সম্ভব হবে। উৎপাদন নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান জানান, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রাথমিকের সব বই ছাপা, বাঁধাই ও পিডিআই শেষ করার আশা রয়েছে। আর বিতরণ নিয়ন্ত্রক মো. খায়রুল ইসলাম খান বলেন, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বই ছাপা ও বাঁধাই শেষ হবে।
মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান কালবেলাকে বলেন, ‘সমঝোতা করে যারা বই নিয়েছে, তারা সময়মতো বই দিতে পারবে না। সর্বশেষ যে রিটেন্ডার হয়েছে সেখানে দেখা গেছে একটির বিপরীতে অনেকগুলো টেন্ডার জমা পড়েছে। দরও কম। কিন্তু আগে একটা টেন্ডারের বিপরীতে একটা টেন্ডার পড়েছে। সবগুলোর দরও ছিল কাছাকাছি। টেন্ডার সমঝোতা ঠেকাতে বোর্ডের কোনো উদ্যোগ ছিল না। আবার ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠানগুলো বড় প্রেসগুলোর সঙ্গে আঁতাত রয়েছে। তাই ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানাভাবে হয়রানি করছে। যাতে কাজ বিলম্ব হয়। এতে বড় প্রেসগুলোর সুবিধা। সবার দেরি হলে তারা প্রশ্নের মুখে পড়বে না। আর যে বই নষ্টের কথা বলা হচ্ছে তা ‘জাস্ট আই ওয়াশ’। এর থেকে বেশি অনিয়মের খবর পাচ্ছি। তাই সরকারকে এখনো নজর দিতে হবে। না হলে যথাসময়ে মানসম্মত বই দিতে পারবে না। ফলে সরকারকে বিপদে পড়তে হবে ‘
সার্বিক বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, কেউ অনিয়ম করলেও জরিমানা করা হচ্ছে। এনসিটিবি এবার যথাসময়ে মানসম্পন্ন বই নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কেউ অনিয়ম করে ছাড় পাবেন না।
তিনি আরও জানান, পিডিআইর বাইরে এনসিটিবির ২৬টি মনিটিরিং টিম মাঠে রয়েছে। এ ছাড়াও এনসিটিবির সিনিয়র কর্মকর্তা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি, প্রাথমিক ও মাদ্রাসা অধিদপ্তরসহ গোয়েন্দা সংস্থাও মাঠে তদারকি করছে।
