এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের লড়াইটা যেন ট্র্যাক-ফিল্ডের বাইরে। সেই লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ কোনো প্রতিযোগী দেশ নয়, বরং নিজেদের অব্যবস্থাপনা, আয়োজকদের গাফিলতি।
সাইক্লিংয়ে সবুর হোসেনের জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ইভেন্টে নামতে না পারার ঘটনা যেমন প্রশ্ন তুলেছে কন্টিনজেন্টের অভ্যন্তরীন যোগাযোগ নিয়ে। নাগোয়ায় পা রাখার পর আরচারি দলের ভোগান্তি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আয়োজকদের আবাসন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। সাইক্লিং, কাবাডি আর নারী ক্রিকেটে খেলা এবং ফলাফলের চেয়ে মাঠের বাইরের ঘটনাই হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সবুর হোসেনের ঘটনাটি শুরু হয় ইভেন্টের দুই দিন আগে। জ্বরে আক্রান্ত হন এই সাইক্লিস্ট, কিন্তু এই তথ্য পৌঁছায়নি শেফ দ্য মিশন কিংবা বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) কোনো কর্মকর্তার কাছে। এমনকি কন্টিনজেন্টের নিজস্ব চিকিৎসকও ছিলেন অন্ধকারে। বাংলাদেশ সাইক্লিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ হাসান নিজেই স্বীকার করেছেন—‘বিষয়টি কাউকে জানাইনি।’ আবাসনস্থলে থাকা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র এবং দাওয়াই দেওয়া হয় সবুরকে। জ্বর না কমায় শেষ পর্যন্ত ইভেন্টেই নামা হয়নি এই সাইক্লিষ্টের। প্রশ্ন উঠছে—২৬০ জনের বিশাল বহরে যখন পর্যাপ্ত কর্মকর্তা ও সাপোর্টিং স্টাফ রয়েছেন জরুরি পরিস্থিতি সামলানোর জন্য, তখন কেন এতটা গোপনীয়তার আশ্রয় নেওয়া হলো? ইভেন্ট শেষ হওয়ার পরই কেবল জানা গেছে পুরো ঘটনা, যা রহস্যাবৃত।
উল্লেখ্য, এই পারভেজ হাসানই ২০১০ সালের এসএ গেমসে সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনায় জড়িয়েছিলেন। যখন বাংলাদেশের এক প্রতিযোগিকে পেছন থেকে মোটরসাইকেলে ঠেলে এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল—আয়োজক দেশ হিসেবে সেই ঘটনায় লজ্জায় পড়তে হয়েছিল বাংলাদেশকে। সবুরের অসুস্থতার খবর একইদিনে আরেক সাইক্লিস্ট শাহাদাত হোসেনের এক ল্যাপ দিয়েই ছিটকে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে মিলে সাইক্লিং ইভেন্টকে করে তুলেছে প্রশ্নবিদ্ধ।
অসুস্থতা যে কারো হতে পারে, সেটা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সেই তথ্য গোপন রাখা, শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্ধকারে রেখে একক সিদ্ধান্তে এগিয়ে যাওয়া—এখানেই লুকিয়ে আছে আসল সংকট। ক্রীড়াঙ্গনে যোগাযোগের এই ঘাটতি শুধু একটি ইভেন্টের ক্ষতিই করে না, প্রশ্ন তুলে দেয় গোটা ব্যবস্থাপনা কাঠামোর ওপর।
এদিকে আবাসন সংকটে ভুগতে হয়েছে আরচ্যারি দলকেও। বাংলাদেশ আরচ্যারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তানভীর রায়হানের ভাষায়, ‘ওয়েলকাম সেন্টারে দলকে অপেক্ষা করতে হয়েছে টানা ১০ ঘণ্টা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও যখন আবাসনে নেওয়া হয়, তখন দেখা যায় চরম রুম সংকট—১৪ জনের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৪ রুম। এই ৪ রুমের মধ্যে আবার কিছু সিঙ্গেল রুমও আছে।’ ফলে দুই কর্মকর্তাকে থাকতে হয়েছে আলাদা হোটেলে। রাতে খাবার জোটেনি, ঘুমও হয়নি স্বস্তিতে। বাথরুমে পানি জমে থাকার মতো দুর্ভোগও পোহাতে হয়েছে তীরন্দাজদের।
বাংলাদেশ কন্টিনজেন্ট থেকে জানানো হয়েছে, ‘১৬ জনের জন্য ৭ রুম বরাদ্দ ছিল। যেখানে এক রুমে তিনজন থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে আবাসন কমিটি সেই বরাদ্দ মানতেই রাজি হয়নি।’ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনার পরও সমাধান না মেলায় শেষমেশ দুজনকে সরিয়ে নিতে হয় অন্য হোটেলে। সংকট এতটাই ঘনীভূত হয় যে, আরচ্যারি কোচের জন্য নিজেদের রুম ছেড়ে দিতে হয় বাংলাদেশ জিমন্যাস্টিকস দলের ম্যানেজার ও কোচকে। ক্রুজ শিপে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৩১ রুম, যেখানে ৭ ডিসিপ্লিনের ৭৯ জন থাকার কথা। কিন্তু বরাদ্দ থাকলেও তা সময়মতো বুঝিয়ে দেয়নি আয়োজকরা। কাবাডি দলের ৩০ জনের জন্য প্রাথমিকভাবে মাত্র ১২ রুম দেওয়া হয়েছিল, পরে অবশ্য বাড়ানো হয় সেই সংখ্যা। কিন্তু আরচারির ক্ষেত্রে নির্ধারিত বরাদ্দ না দেওয়াতেই তৈরি হয় এই বিশৃঙ্খলা।
এদিকে মাঠের লড়াইয়েও স্বস্তি মেলেনি বাংলাদেশের। পাকিস্তানের কাছে হেরে পদকের স্বপ্ন ভেঙেছে নিগার সুলতানা জ্যোতির নারী ক্রিকেট দলের। কাবাডিতে জাপানের কাছে হার সমীকরণ জটিল করেছে লাল-সবুজদের জন্য। দুই জায়গায় বাইরের ঘটনা খেলায় প্রভাব ফেলেছে—যা নারী ক্রিকেট ও পুরুষ কাবাডি দলের কোচও স্বীকার করে নিয়েছেন।
