জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ে ‘লিগ্যাল অফিসার’ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান। তার দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর চলছে নানা আলোচনা।
‘লিগ্যাল অফিসার’ পদটি কী, এই পদে থেকে তিনি কী ধরনের দায়িত্ব পালন করবেন—এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। চলতি বছরের ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৮১তম অধিবেশন শুরু হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর এবং এটি ২০২৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, জাইমা রহমান লিগ্যাল অফিসার বা আইন কর্মকর্তা হিসেবে সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ অফিসের অধীনে কাজ করবেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কর্মকর্তাদের তালিকায় জাইমা রহমানের নাম ও পদবিও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে কর্মরতদের তালিকায় ৪০ জনের মধ্যে জাইমা রহমান ছাড়াও আরও পাঁচজন বাংলাদেশি রয়েছেন।
জাইমা রহমানের দায়িত্বের ধরন বুঝতে হলে প্রথমে সাধারণ পরিষদের সভাপতির ভূমিকা জানা প্রয়োজন। জাতিসংঘের বিধি অনুযায়ী, সভাপতি সাধারণ পরিষদের প্লেনারি বৈঠক বা পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন পরিচালনা করেন, আলোচনার নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করেন।
এছাড়া অধিবেশন বা বৈঠকে প্রতিনিধিদের বক্তব্যের সুযোগ দেন, প্রশ্ন উত্থাপন ও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন এবং কোনো ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ উত্থাপিত হলে তার ওপর রুলিং দেন সভাপতি।
তার এই ধরনের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধি, জাতিসংঘ সনদ, সাধারণ পরিষদের কার্যপ্রণালি ও আগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে সভাপতির কার্যালয়ে একজন লিগ্যাল অফিসারের মূল কাজ হলো এসব আইনি ও প্রক্রিয়াগত বিষয়ে সভাপতিকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া।
অর্থাৎ সাধারণ পরিষদের কোনো বৈঠকে কোনো প্রতিনিধি নিয়মের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুললে, কোনো প্রস্তাবের সংশোধনী বা কার্যপ্রণালি নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত কীভাবে নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ করা হবে—এসব বিষয়ে সভাপতিকে আইনি ও প্রক্রিয়াগত দিক থেকে সহায়তা করতে পারেন লিগ্যাল অফিসার।
সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এই পদে থাকা ব্যক্তি জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগের কর্মকর্তা নন, তিনি মূলত সরাসরি সাধারণ পরিষদের সভাপতির ব্যক্তিগত উপদেষ্টা হিসেবেই কাজ করবেন।
রেজুলেশন কীভাবে উত্থাপন হবে, কোনো দেশ পয়েন্ট অব অর্ডার তুললে সভাপতি কী রুলিং দেবেন, একটি প্রস্তাবের সংশোধনী গ্রহণযোগ্য কি না- এসব বিষয়ে লিগ্যাল অফিসার সভাপতিকে আইনি পরামর্শ দেন বলে জানিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
সাধারণ পরিষদে অনেক সময় স্পর্শকাতর বিষয়- যেমন ফিলিস্তিন, ইউক্রেন ইস্যু- নিয়ে আলোচনা হয়। তখন সভাপতি যেন নিরপেক্ষ থাকতে পারেন এবং তার সিদ্ধান্তকে যেন কেউ ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলতে না পারে, সেজন্য জাতিসংঘ সনদের আর্টিকেল ও অতীতের নজির তুলে ধরে আইনি সুরক্ষা দেন লিগ্যাল অফিসার।
বিশেষ করে সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে কোনো ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’-এর বিষয়ে রুলিং দিতে হলে সংশ্লিষ্ট নিয়ম ও আগের নজির বিবেচনা করতে হয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে লিগ্যাল অফিসারের পরামর্শ সভাপতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতি বৈঠকের কার্যক্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন এবং নিয়ম পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এ ছাড়া সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন প্রস্তাব, সিদ্ধান্ত ও কার্যপ্রণালির আইনি বা বিধিগত দিক পর্যালোচনা করাও এ ধরনের দায়িত্বের অংশ হতে পারে।
কোনো বিষয়ে জাতিসংঘের বিদ্যমান নিয়ম, সনদ বা প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া প্রযোজ্য কি না, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি সম্পর্কে সভাপতিকে পরামর্শ দেওয়ার কাজও করতে হয়।
সভাপতির কার্যালয়কে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রক্রিয়াগত সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতেও লিগ্যাল অফিসার ভূমিকা রাখতে পারেন। আন্তর্জাতিক আইন বা আইনি বিষয়ে সভাপতির বক্তব্য, চিঠি কিংবা কোনো আনুষ্ঠানিক নথি তৈরির ক্ষেত্রেও আইনি দিক পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এ দায়িত্বের আওতায় পড়তে পারে।
সাধারণ পরিষদে ওঠা কোনো রেজুলেশন বা প্রস্তাব আগের নিয়ম বা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, বাজেট সংক্রান্ত প্রস্তাবে অন্য কমিটির অনুমোদন লাগবে কি না, লিগ্যাল অফিসার এসব বিষয়ও যাচাই করেন।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—‘লিগ্যাল অফিসার’ পদটি শুনে এটিকে জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগের কোনো সাধারণ দায়িত্বের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
জাইমা রহমানকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের তালিকায় লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ তার দায়িত্ব মূলত সভাপতির কার্যালয়ের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এছাড়া এই পদে বেশ কিছু দাপ্তরিক কাজও রয়েছে। জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগসহ অন্যান্য আইনি সংস্থার সঙ্গে সভাপতির কার্যালয়ের সমন্বয় করা এবং সভাপতিকে যদি আন্তর্জাতিক চুক্তি বা আইনি বিষয়ে বক্তব্য দিতে হয়, তার খসড়া তৈরিতেও সহায়তা করবেন তিনি।
এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সভাপতি হিসেবে যেসব কাজ খলিলুর রহমান করবেন তার আইনি দিকগুলোই লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দেখভাল করতে হবে জাইমা রহমানকে।
তার মতে, এই পদে কাজ করার জন্য যথেষ্ট অভিজ্ঞ না হলেও যে যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন সেটি জাইমা রহমানের রয়েছে।
সব মিলিয়ে সাধারণ পরিষদে সভাপতির কার্যক্রম যেন জাতিসংঘের আইন ও রীতির ভেতরেই থাকে, সে বিষয়ে আইনি দিকগুলো দেখভালের দায়িত্ব থাকবে লিগ্যাল অফিসারের ওপর।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
