ইমরানুরের দৌড়ে ফিরল পুরোনো গল্প

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৩ পিএম

ইমরানুর রহমান দৌড়েছেন, প্রাথমিক পর্ব টপকে পা রেখেছেন সেমিফাইনালে—এ নিয়ে সবাই যেন নড়েচড়ে বসল। চারদিকে একটাই প্রশ্ন—এশিয়ান গেমসে এমন কীর্তি আগে কারও ছিল কি না?

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ধুলো ঝেড়ে বের করা হলো ইতিহাসের ভাঙা অ্যালবাম। যেখানে জ্বলজ্বল করছে নজরুল ইসলাম রুমি, মিলজার হোসেন, মোশাররফ হোসেন, সাইদুর রহমান ডনের নাম। অ্যালবামের পাতায় আফতাব মোল্লা ও শাহ আলমদের খুঁজে পাবেন, তারা ইহজগতে নেই; রেকর্ডেই অস্তিত্ব টিকে আছে দুই সাবেক ক্রীড়াবিদের।

একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা শুধু প্রথম রাউন্ডের বেড়াই ডিঙাতেন না, রীতিমতো হানা দিতেন পদকের লড়াইয়ে। এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চের অ্যাথলেটিকস থেকে পদক জেতা হয়নি ঠিকই, কিন্তু লড়াইটা ছিল জীবন বাজি করার মতো করে। গল্পের শুরু ১৯৮২ সালে, দিল্লি এশিয়ান গেমসে। লংজাম্পের রানওয়েতে নজরুল ইসলাম রুমি এখন স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান। লাফের দূরত্বটাও ঠিকঠাক মনে করতে পারেন না—‘৭.১৬ না কত মিটার, ঠিক মনে পড়ছে না। ফাইনালে ষষ্ঠ হয়েছিলাম।’ একটা ব্যাপারে তার গলায় খুশির রেশ স্পষ্ট, ‘কেউ একজন অন্তত পুরোনো দিনের খোঁজ নিতে এসেছে।’ তার আক্ষেপ, বর্তমান প্রজন্ম জানেই না যে একসময় বাংলাদেশ প্রথম-দ্বিতীয় রাউন্ড টপকে, সেমিফাইনাল জিতে সরাসরি ফাইনালেও পা রাখত।

ফাইনালের শীর্ষ তিনজন পান পদক, বাকি তিনজনকে প্রদান করা হয় ডিপ্লোমা আর সার্টিফিকেট। নজরুল ইসলাম রুমির ষষ্ঠ স্থানের সেই সার্টিফিকেট আজও যত্নে তোলা আছে, কালবেলার অনুরোধে যার অনুলিপিও তিনি পাঠিয়েছেন হাসিমুখে। তার মতোই বুক ভার একসময়ের মধ্যপাল্লার দৌড়বিদ মিলজার হোসেনের। ১৯৮৬ সালের গেমসে ৮০০ মিটারের ফাইনালে পঞ্চম হয়েছিলেন তিনি, সময় নিয়েছিলেন ১ মিনিট ৫১.১৬ সেকেন্ড, যা আজও গেমসের অ্যাথলেটিকসে কোনো বাংলাদেশির সর্বোচ্চ কীর্তি হিসেবে টিকে আছে। মজার ব্যাপার, এত বড় অর্জনের মালিক এই দুই কিংবদন্তির নামই এখন অচেনা তরুণ প্রজন্মের কাছে!

তালিকাটা অবশ্য আরও লম্বা। সাঁতারে মোশাররফ হোসেন, হ্যামার থ্রোয়ে প্রয়াত আফতাব মোল্লা—দুজনেই খেলেছিলেন ১৯৮২ সালের ফাইনাল। ১৯৮৬ সালে প্রয়াত শাহ আলম ১০০ মিটারে আর সাইদুর রহমান ডন ২০০ মিটারে প্রথম রাউন্ড পেরিয়ে ঢুকেছিলেন দ্বিতীয় রাউন্ডে। এসব জানেন এমন লোকসংখ্যা খুবই কম দেশে। খোদ অ্যাথলেটিকস সংশ্লিষ্টরাই অতীতের নানা ইতিবাচক দিক নিয়ে উদাসীন। মিলজার হোসেনের গলায় এ নিয়ে হতাশার সুর স্পষ্ট, ‘অতীতের এসব ঘটনা জানার আগ্রহ কারও নেই, বর্তমান প্রজন্মকে উজ্জীবিত করতে এমন ঘটনা সম্পর্কে জানানোর উদ্যোগও নেই।’

আক্ষেপের গল্প এখানেই শেষ নয়। এশিয়ান গেমস তো দূরের কথা, বাংলাদেশ এখন এসএ গেমসেও রীতিমতো ব্যাক-বেঞ্চার। একসময়ের অ্যাথলেটিকস-সাঁতারের পরাশক্তি আজ তাকিয়ে থাকে ভারত-শ্রীলঙ্কার ফাঁকফোকরের দিকে, পদকের পরিকল্পনা সাজায় তাদের ভুলের অপেক্ষায়। এই বাস্তবতাতেই ইমরানুর রহমানের এক রাউন্ড টপকানো হয়ে ওঠে বিশাল শিরোনাম—হাসির নাকি কান্নার, সেই সিদ্ধান্ত পাঠকের হাতেই ছেড়ে দেওয়া যাক।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন