পটুয়াখালীর বাউফলে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আখতার হোসেনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আদায় ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষকদের ছুটি অনুমোদন, টাইম স্কেল ও অডিট খরচের নামে অর্থ আদায়, স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে উৎকোচ গ্রহণ এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক বদলির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বাউফল উপজেলার ২৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্তবর্ণের চার্ট (১৭ আইটেম) সরবরাহের নামে ১৭০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। অথচ বাজারমূল্য অনুযায়ী ওই চার্টের দাম মাত্র ৭০০ টাকা। সে হিসেবে প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে অতিরিক্ত ১০০০ টাকা করে মোট ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে এই চার্ট ক্রয়ের ব্যয় দেখানো হলেও নিয়ম অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকরা তা নিজে ক্রয়ের কথা। কিন্তু শিক্ষা কর্মকর্তা আখতার হোসেন জোরপূর্বক তা সরবরাহ করে এই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া স্লিপ প্রকল্পের মোট বরাদ্দ থেকে প্রতিটি বিদ্যালয় বাবদ ২ হাজার টাকা করে শিক্ষা কর্মকর্তাকে উৎকোচ দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাশাপাশি গত জুন মাসে ‘জুন ফাইনাল’-এর কথা বলে হিসাবরক্ষণ অফিসের নামে প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা করে আদায়েরও অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শিক্ষক বদলিকে কেন্দ্র করেও রমরমা বাণিজ্য চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, মন্ত্রণালয় কর্তৃক বদলি বন্ধের নির্দেশনা উপেক্ষা করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পেছনের তারিখ উল্লেখ করে অন্তত ৬ জন শিক্ষককে বদলির সুপারিশ করেছেন তিনি।
সম্প্রতি বাউফলের ধাউড়াভাঙা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত সুলতানাকে বিধিবহির্ভূতভাবে দুমকি উপজেলার নলদোয়ানী পাঙ্গাশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলির জন্য তিনি সুপারিশ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী স্বামীর স্থায়ী ঠিকানায় নারী শিক্ষকদের বদলির বিধান থাকলেও, নুসরাত সুলতানার স্বামীর বাড়ি বরিশাল শহরে আর বাবার বাড়ি বগা এলাকায়। অভিযোগ রয়েছে, তার ব্যবসায়ী স্বামীর কাছ থেকে বড় অংকের উৎকোচ নিয়ে এই বদলির সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ডেপুটেশন এবং মাতৃত্বকালীন বা চিকিৎসাজনিত ছুটি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত হারে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীরা আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়মিত অফিস করেন না। বিশেষ করে বৃহস্পতি ও রোববার স্কুল পরিদর্শনের নাম করে তিনি অধিকাংশ সময় ভোলায় নিজের বাড়িতে অবস্থান করেন। অফিসে গেলে কর্মচারীরা জানান তিনি পরিদর্শনে আছেন।
এ ছাড়া শিক্ষকদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত দুর্ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার বা অফিসের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত হলে শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ করে নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাউফল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আখতার হোসেন তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি কুচক্রীমহল আমার সুনাম ক্ষুণ্ন করার জন্য এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
যুক্তবর্ণের চার্ট ও স্লিপ বরাদ্দ নিয়ে তিনি বলেন, ‘যুক্তবর্ণের চার্ট সরবরাহের বিষয়টি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাধীন এবং বিদ্যালয়গুলোর মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ ক্রয়ের সুবিধার জন্যই করা হয়েছে। এখানে কোনো অতিরিক্ত বা জোরপূর্বক টাকা নেওয়া হয়নি। স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দের বিষয়ে উৎকোচের কথা সম্পূর্ণ বানোয়াট।’
বদলি বাণিজ্য ও ছুটি সংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘শিক্ষক বদলি বা ডেপুটেশনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সরকারি বিধিমালা ও নীতিমালা পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে কাউকে বদলির সুপারিশ বা আর্থিক লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই। একইভাবে মাতৃত্বকালীন বা চিকিৎসাজনিত ছুটিও সরকারি বিধি মোতাবেক দেওয়া হয়।’
অফিসে অনুপস্থিতি ও অসদাচরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিয়মিত অফিস করি এবং রুটিন অনুযায়ী স্কুল পরিদর্শনে যাই। শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সত্য নয়, আমি সবসময় শিক্ষকদের সম্মান করি।’
