কিছু ফুটবলার মাঠে নামেন, ম্যাচ খেলেন, গোল করেন এবং একসময় বিদায় নেন। আর কিছু ফুটবলার বিদায় নিলেও তাদের সময়টা শেষ হয় না। তারা থেকে যান মানুষের স্মৃতিতে, আবেগে, গল্পে।
লিওনেল মেসি সেই দ্বিতীয় দলের মানুষ।
বল পায়ে তার ছুটে চলা, একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে যাওয়া, চোখের পলকে দেওয়া নিখুঁত পাস কিংবা হঠাৎ করা এক গোল- এসব শুধু ফুটবলের দৃশ্য নয়, কোটি মানুষের কাছে স্মৃতি। সেই মেসিই এবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামতে যাচ্ছেন।
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন এই মহাতারকা। তবে দেশের মাটিতে প্রিয় সমর্থকদের সামনে শেষবারের মতো জাতীয় দলের প্রিয় জার্সি গায়ে তোলার সুযোগটি তিনি নিচ্ছেন। বুধবার ভোরে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ উপস্থিতি।
একটি ম্যাচ। হয়তো ৯০ মিনিট। অথচ সেই ৯০ মিনিটের ভেতরেই যেন গুটিয়ে যাবে দুই দশকেরও বেশি সময়ের এক মহাকাব্য।
আর্জেন্টিনার রোসারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি একদিন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হবেন, এটা কি কেউ জানত? উত্তর হ্যাঁ বা না দুটোই হতে পারে। কারণ তার জন্য যে ম্যারাডোনার দেশে। যেখানে ম্যারাডোনা হওয়ার ব্রত নিয়ে বড় হয় প্রতিটা ক্ষুদে ফুটবলাররা। মেসিও হয়তো সেই স্বপ্ন দেখেছিলেন। নিজের ইশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা, লড়াই করার ক্ষমতা, ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা আর সঙ্গে অসাধারণ ধারাবাহিকতায় মেসি ধীরে ধীরে ‘ছাড়িয়ে গেছেন’ ফুটবল ইশ্বর ম্যারাডোনাকেও।
তবে জাতীয় দলের হয়ে তার পথটাও এতটা মসৃণ ছিল না।
শিরোপার অপেক্ষা, ফাইনালে হার, সমালোচনা- সবকিছুর মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে তাঁকে। একসময় প্রশ্ন উঠেছিল, ক্লাব ফুটবলে এতটা সফল মেসি কি কখনো আর্জেন্টিনাকে বড় কোনো শিরোপা এনে দিতে পারবেন?
শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তরও মেসিই দিয়েছেন।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। এরপর কোপা আমেরিকার একাধিক ফাইনালে ব্যর্থতা। হতাশা এতটাই গভীর হয়েছিল যে একসময় জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি।
কিন্তু ফিরে এসেছিলেন।
আর সেই ফিরে আসার পরই যেন বদলে যায় গল্পের গতিপথ।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়। ২০২২ সালে ফিনালিসিমা। এরপর কাতার বিশ্বকাপ। মরুর দেশে
অবশেষে সেই ট্রফিটিও এল, যার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিল আর্জেন্টিনা।
২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে ওঠে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি। যে ট্রফির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার ক্যারিয়ার নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটিও।
সেদিন মেসি শুধু একটি শিরোপা জেতেননি। নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকেও যেন পূর্ণতা দিয়েছিলেন।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পরিসংখ্যানই তার ক্যারিয়ারের আলাদা এক গল্প।
বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে মাঠে নামলে জাতীয় দলের হয়ে তার ম্যাচ হবে ২০৮ (আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ)। দেশের জার্সিতে ১২৫ গোলও তার নামের পাশে। এই জায়গাও চূড়ায় অবস্থান ফুটবল জাদুকরের।
বিশ্বকাপের ইতিহাসেও তার রেকর্ড অনন্য। ২১ গোল ও ১২ অ্যাসিস্টে বিশ্বকাপে মেসির গোল-অবদান ৩৩টি। তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে শুরুর একাদশে মাঠে নামা একমাত্র খেলোয়াড়ও তিনি।
তবে প্রশ্নটা থেকেই যায়, মেসিকে কি শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায়?
সম্ভবত যায় না।
কারণ কিছু খেলোয়াড়ের মূল্য সংখ্যার চেয়েও অনেক বড়।
তাইতো মেসির শেষ ম্যাচ সামনে রেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিও।
মেসিকে নিয়ে তার মূল্যায়ন ছিল এমনই, ‘মেসি এমন কিছু রেখে যাচ্ছে, যার কোনো তুলনা নেই।’
স্কালোনির কাছে মেসির বিশেষত্ব শুধু তার ফুটবলীয় দক্ষতায় সীমাবদ্ধ নয়। মাঠের বাইরে তার আচরণ, সতীর্থদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকা তার সঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ার, প্রতিটি ম্যাচের প্রস্তুতি- সবকিছুই তাঁকে আলাদা করেছে।
স্কালোনি বলেছেন, মাঠে মেসিকে পাওয়ার অনুভূতিই অনন্য। ফুটবল মাঠে মেসি যা করেন, অন্য কাউকে সেভাবে করতে তিনি কখনো দেখেননি। আর মেসির অনুপস্থিতিই হবে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শূন্যতাগুলোর একটি।
স্কালোনির চোখে মেসি শুধু একজন অসাধারণ ফুটবলার নন; তিনি সতীর্থদের জন্যও এক অনুকরণীয় উদাহরণ। সবার আগে অনুশীলনে আসা, সবার শেষে বের হওয়া, নিজের যত্ন নেওয়া এবং প্রতিটি ম্যাচকে সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা- সবকিছুতেই মেসি আলাদা।
আর তাই তার উত্তরাধিকার শুধু গোল আর ট্রফিতে আটকে থাকবে না।
তিনি রেখে যাচ্ছেন একটি মানদণ্ড।
মেসির শেষ ম্যাচেও গ্যালারি আবারও ভরে উঠবে। হাতে থাকবে আর্জেন্টিনার পতাকা, গায়ে থাকবে মেসির জার্সি, গ্যালারিতে উঠবে তার নাম।
আর মেসি?
সম্ভবত আগের মতোই বল পায়ে নিয়ে মাঠে হাঁটবেন।
হয়তো একজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাবেন। হয়তো সতীর্থকে দেবেন নিখুঁত একটি পাস। হয়তো গোলও করবেন।
কিন্তু এবার প্রতিটি মুহূর্তের অর্থ হবে আলাদা।
কারণ সবাই জানবে- এই দৃশ্য আর দেখা যাবে না।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর কোনো বিশ্বকাপ অভিযান নয়। আর কোনো কোপা আমেরিকার রাত নয়। আর কোনো ফাইনালের আগে মেসিকে ঘিরে সেই প্রত্যাশাও নয়।
শেষে থাকবে শুধু স্মৃতি। থাকবে শুধু আক্ষেপ। ইশ! যদি আজকের ম্যাচে যদি মেসি থাকতো।
মেসির বিদায় মানেই মেসির গল্পের শেষ নয়। বরং এটি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি।
যে ছেলেটি একদিন আর্জেন্টিনার হয়ে শিরোপা জিততে না পারার আক্ষেপে কেঁদেছিলেন, সেই ছেলেটিই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ হাতে দাঁড়িয়েছেন।
তাই মেসির বিদায়ের গল্পে আছে শুধু পূর্ণতা।
কারণ, তিনি যা চেয়েছিলেন, তার সবটাই পেয়েছেন। যে ট্রফির জন্য একটি প্রজন্ম অপেক্ষা করেছে, সেটিও এনে দিয়েছেন।
এখন বাকি শুধু শেষবারের মতো মাঠে নামা।
শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি পরা।
শেষবারের মতো গ্যালারির দিকে তাকানো।
আর শেষ বাঁশির পর হয়তো হাত তুলে বলা- বিদায়।
তবে ফুটবলে কিছু বিদায় কখনো পুরোপুরি বিদায় হয় না।
মেসি মাঠ থেকে চলে যাবেন। কিন্তু তার কোটি ভক্তের স্মৃতিতে, ফুটবলের ইতিহাসে এবং কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি থেকে যাবেন- একটি নাম হয়ে, একটি যুগ হয়ে, একটি অতুলনীয় গল্প হয়ে।
লিওনেল মেসি।
