নতুন তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিচ্ছিন্ন তথ্যকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এজন্য একটি নতুন তথ্যভাণ্ডার করছে বিবিএস। নতুন এই তথ্যভাণ্ডারে দেশের কোথায় কোন শিল্প-কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, কোন এলাকায় কোন খাতের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি, কোন প্রতিষ্ঠান চালু, কোনটি সাময়িক বন্ধ কিংবা পুরোপুরি বন্ধ—এসব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া যাবে। কোনো শিল্পগোষ্ঠীর অধীনে কতটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং তারা কোন কোন খাতে ব্যবসা করছে, ভবিষ্যতে সেই তথ্যও জানা যাবে।
এ লক্ষ্যে একটি স্থায়ী স্ট্যাটিস্টিক্যাল বিজনেস রেজিস্টার (এসবিআর) তৈরি করছে বিবিএস। অর্থনৈতিক শুমারি-২০২৪ প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হচ্ছে এই ব্যবসা তথ্যভাণ্ডার। ইতোমধ্যে এর অধিকাংশ তথ্য একীভূত করার কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে তথ্য দেখানোর জন্য একটি ড্যাশবোর্ড তৈরির কাজ চলছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে এর কার্যকর সংস্করণ চালুর লক্ষ্য রয়েছে। বৃহস্পতিবার মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে অর্থনৈতিক শুমারি-২০২৪-এর এসবিআর কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে এসব তথ্য জানা যায়।
বিবিএসের অর্থনৈতিক শুমারি-২০২৪-এর যুগ্ম সচিব (সংযুক্ত) ও প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. দীপঙ্কর রায় বলেন, প্রচলিত অর্থনৈতিক শুমারির মতো নির্দিষ্ট সময় পরপর নতুন করে এই নিবন্ধন তৈরি করতে হবে না। এটি স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে পরিচালিত হবে এবং নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। অর্থনৈতিক শুমারি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিবিএস উইংয়ের কাছে এর দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে।
২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে অর্থনৈতিক এককের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। ২০১৩ সালের শুমারিতে এই সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫টি। অর্থাৎ এক দশকে অর্থনৈতিক এককের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। তবে এসব অর্থনৈতিক এককের বড় একটি অংশ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে। নতুন তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এসব বিচ্ছিন্ন তথ্যকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক শুমারিতে শনাক্ত বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পরবর্তী সময়ে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র, কুটির ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এই তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নাম ও অবস্থানের পাশাপাশি সেটি বর্তমানে চালু কি না, সাময়িকভাবে বন্ধ নাকি পুরোপুরি বন্ধ—সেই তথ্যও থাকবে। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন, বাণিজ্যিক লাইসেন্স, ভ্যাট বা ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন), ব্যবসায়ী সংগঠন, চেম্বার বা সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদসহ বিভিন্ন তথ্য যুক্ত করা হবে।
এই তথ্যভাণ্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে ভৌগোলিক বিশ্লেষণ। কোনো নির্দিষ্ট শিল্প খাত নির্বাচন করলে দেশের কোন জেলা বা অঞ্চলে ওই খাতের কত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কোথায় শিল্পের ঘনত্ব বেশি এবং কোথায় কম—তা মানচিত্রের মাধ্যমে দেখা যাবে। স্থানীয় পর্যায়েও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসবিআরের মাধ্যমে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর চিত্রও স্পষ্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অধীনে থাকা একাধিক প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে কোনো গোষ্ঠীর কতটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং তারা কোন কোন খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা জানা যাবে। ফলে একজন শিল্পোদ্যোক্তা বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ব্যবসার সামগ্রিক বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
ভবিষ্যতে একটি ইউনিক বিজনেস আইডি চালুর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে বিবিএস। এটি চালু হলে একই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন সরকারি তথ্যভাণ্ডারে একই পরিচয়ে শনাক্ত করা সহজ হবে। এর মাধ্যমে আর্থিক, কর ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তথ্যের মধ্যে সংযোগ তৈরির সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে বড় তথ্যভাণ্ডার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্তমান তথ্যের সঙ্গে পুরোনো তথ্য মিলিয়ে দেখার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া বিচ্ছিন্ন বা স্বঘোষিত তথ্য যাচাই এবং কোনো প্রতিষ্ঠান বাস্তবে চালু আছে কি না, তা নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়তে পারে।
অনুষ্ঠানে ডেভেলপমেন্ট জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশের (ডিজেএফবি) সভাপতি আরিফুর রহমান বলেন, বিবিএসের তথ্য ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে অনেক নতুন সাংবাদিকের কারিগরি ধারণা সীমিত। ফলে জটিল তথ্যের ব্যাখ্যায় ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তার মতে, তথ্যের কারিগরি দিক সাংবাদিকদের কাছে পরিষ্কার না হলে সাধারণ মানুষের কাছে ভুল ব্যাখ্যা পৌঁছাতে পারে এবং বিবিএসের তথ্যের ওপরও মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাংবাদিকদের ধারণা বাড়ানো প্রয়োজন।
পরিদর্শনে ডিজেএফবির সাংগঠনিক সম্পাদক এম আর মাসফি, অর্থ সম্পাদক আলতাফ হোসাইন, দপ্তর সম্পাদক আরমান হোসাইন, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জহির রায়হানসহ সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অর্থনৈতিক শুমারি-২০২৪ প্রকল্পের উপপরিচালক মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এতে অংশ নেন।
