সাদা-আকাশির মায়া ছেড়ে…

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪০ এএম

আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচটি ছিল এক দীর্ঘ মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়। বুয়েন্স আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় শুধু একটি প্রীতি ম্যাচের ফল নয়; এটি ছিল এক কিংবদন্তির প্রতি জাতির শেষ আনুষ্ঠানিক অভিবাদন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যে মানুষটি আর্জেন্টিনার ফুটবলের আশা, ভরসা, আনন্দ ও বেদনার সঙ্গে মিশে ছিলেন, সেই মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে আবেগঘন এক সন্ধ্যায়।

মেসির আর্জেন্টিনা-যাত্রার শুরুটিও ছিল অন্যরকম। ২০০৪ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার এক প্রতিভাবান কিশোরকে স্পেনের জাতীয় দলে পাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাবা হোর্হে মেসি চেয়েছিলেন, ছেলের আন্তর্জাতিক পরিচয় যেন জন্মভূমি আর্জেন্টিনার সঙ্গেই গড়ে ওঠে।

আর্জেন্টাইন ফুটবল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো একটি ভিডিওই শেষ পর্যন্ত বদলে দেয় গল্পের গতিপথ। সেই ভিডিও দেখে কোচিং স্টাফের বিস্ময় ছিল এতটাই গভীর যে, মেসির খেলা দ্রুতগতিতে ধারণ করা হয়েছে কি না, সেটিই প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল। বাস্তবতা ছিল আরও চমকপ্রদ—সেটিই ছিল তার স্বাভাবিক গতি।

এরপর বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে মেসি জায়গা করে নেন আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে। দীর্ঘ এ যাত্রায় তিনি খেলেছেন ২০৮টি ম্যাচ। পেয়েছেন বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত অর্জন। কিন্তু তার খেলার পথ কখনো মসৃণ ছিল না। একসময় জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে এত বেশি নিয়েছিলেন যে, নিজেকেই যেন দলের জন্য বোঝা মনে হতে শুরু করেছিল। সেই হতাশা থেকে ২০১৬ সালে একবার অবসরও নিয়ে ফেলেন। তারপর ফিরে আসা। কোপা এবং বিশ্বকাপ জয়। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ফলবান সময় পার করে বুধবার আকাশি নীল জার্সিটা তুলে রাখলেন। তাই এ কথা লেখা যেতেই পারে, মেসির শেষ ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে শুধু একজন তারকার বিদায় নয়, সেই দীর্ঘ সংগ্রামেরও প্রতিফলন ছিল।

বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে মেসিকে ঘিরে ছিল উৎসবের আবহ। দর্শকের মুখে তার মুখোশ, গ্যালারিতে সংগীত, আর ম্যাচ শুরুর আগেই তৈরি হয়েছিল বিদায়ের আবেগ। তবে মাঠে শুরুটা খুব সহজ ছিল না। বেনিন সংগঠিতভাবে রক্ষণ সামলেছে এবং পাল্টা আক্রমণে আর্জেন্টিনাকে অস্বস্তিতেও ফেলেছে। মেসি বারবার সুযোগ তৈরি করেও গোল পাচ্ছিলেন না। যেন তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পুরোনো গল্পেরই পুনরাবৃত্তি—প্রতিভা আছে, চেষ্টা আছে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভাগ্য বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য দৃশ্যপট বদলে যায়। নিকোলাস ওতামেন্দির গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। প্রতীকী দিক থেকেও গোলটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মেসির পাশাপাশি ওতামেন্দিও জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতিতে ছিলেন। এরপর আসে ভবিষ্যতের বার্তা। তরুণ নিকো পাজ মাঠে নেমে মেসির সঙ্গে চমৎকার বোঝাপড়া তৈরি করেন এবং অসাধারণ বাঁকানো শটে গোল করেন। যেন এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দিচ্ছে।

এরপর আসে রাতের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পায়, আর হাজারো মোবাইল ফোন উঠে যায় আকাশে। মেসি ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠান। সেই গোল ছিল শুধু স্কোরবোর্ডের আরেকটি সংখ্যা নয়; এটি ছিল তার জাতীয় দলের ক্যারিয়ারের শেষ স্মৃতিগুলোর একটি। শেষ বাঁশির পর সতীর্থদের চোখে জল, মেসির আবেগঘন বক্তব্য এবং পরিবারের সঙ্গে তার বিদায়ী পরিক্রমা পুরো মুহূর্তটিকে আরও স্মরণীয় করে তোলে। তবে মেসির বিদায় মানেই আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ অন্ধকার—এমনটা মনে করার কারণ নেই। বরং কোচ লিওনেল স্কালোনির থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন আশার জন্ম দিচ্ছে। রোমেরো, এনজো ফের্নান্দেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেস ও লাওতারো মার্তিনেসের মতো খেলোয়াড়রা এরই মধ্যে দলের শক্ত ভিত তৈরি করেছেন। নিকো পাজ, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুনো, জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ানি ও লিওনেল ফ্লোরেসের মতো তরুণদের মধ্যে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও স্পষ্ট।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য একটাই—মেসিকে কীভাবে প্রতিস্থাপন করবে আর্জেন্টিনা? বাস্তবে তার সরাসরি উত্তরসূরি পাওয়া সম্ভব নয়। মেসি শুধু একজন গোলদাতা বা প্লে-মেকার নন; তিনি একটি প্রজন্মের মানসিক শক্তির প্রতীক। তাই তার জায়গা পূরণ করার বদলে আর্জেন্টিনাকে নতুন প্রজন্মের নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে হবে। তবু মেসির গল্পের দরজা হয়তো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। জাতীয় দলের দায়িত্ব কাঁধে না থাকলে তিনি ভবিষ্যতে তরুণদের পাশে কোনো ভূমিকায় ফিরতে পারেন। অনেকটা গুরু হিসেবে, যিনি নতুনদের হাতে নিজের অভিজ্ঞতার ‘জাদুর কাঠি’ তুলে দেবেন।

সেই সম্ভাবনা ভবিষ্যতের গর্ভে লুকানো থাকা। মাত্রই অতীত হওয়া বুধবার আমরা দেখলাম মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে আর্জেন্টিনা তাকে প্রাপ্য সম্মানেই বিদায় জানিয়েছে। একটি যুগ শেষ হয়েছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার থেকেই শুরু হবে আর্জেন্টিনার পরবর্তী অধ্যায়। যুগান্তের পর যেমন আসে নবযুগ!

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন