তবু হাল ছাড়েননি রানী…

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম

দীর্ঘ দাবা ক্যারিয়ারে বহু বোর্ডে বসেছেন, সবচেয়ে কঠিন চালটি দিতে হয়েছে বোর্ডের বাইরে। সেখানে প্রতিপক্ষ ছিল সময়, রানী হামিদকে প্রতিটি চালের দাম দিতে হয়েছে প্রিয়জনের নাম দিয়ে। তাতে দাবার বোর্ড থেকে তীক্ষ্ণ মনোযোগ সরাননি।

৮৩ বছর বয়সে রানী হামিদ আবারও বসলেন দাবার বোর্ডে। জাতীয় মহিলা দাবার বাছাই পর্বে নয় ম্যাচের দুটি হেরেছেন; একটি ড্র, বাকি ছয় ম্যাচে জয়। সাড়ে ৬ পয়েন্টে চতুর্থ হয়েছেন। যা রানী হামিদকে জাতীয় দাবায় খেলার ছাড়পত্র এনে দিয়েছে। এই ফলাফলের পেছনে রয়েছে নিঃশব্দ লড়াইয়ের গল্প।

দুই দশকের বেশি আগে স্বামী কর্নেল হামিদকে হারিয়েছেন। সেই শূন্যতা লম্বা পথ পাড়ি দেওয়ার পর তিন বছর আগে চলে গেলেন ছেলে ববি হামিদ। মা হয়ে সন্তানের বিদায় দেখার চেয়ে বড় আঘাত আর কী হতে পারে! মাস চারেক আগে আকস্মিকভাবে চলে গেছেন নাতনি কারিনা কায়সার। এক জীবনে তিন বিদায়—প্রতিটি ভেতর ফাঁকা করে দেওয়ার মতো।

তাতেও থামেননি বাংলাদেশ ‘দাবার রানী’। নিকট অতীত হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে থাকে। কারিনার প্রয়াণে সাম্প্রতিক ঘটনা, কিন্তু সেটা সময়ের কারণেই ধাক্কা নয়। শুনুন এ সম্পর্কিত রানী হামিদের কথাই, ‘কারিনার চলে যাওয়া মেনে নেওয়ার মতো নয়। এর পরও জীবন চালিয়ে যেতে হয়।’ শোককে অস্বীকার করেননি তিনি, আবার শোকের কাছে হারও মানেননি। দাবার ভাষায় বললে, তিনি জানেন কোন চাল ফেরানো যায় না, আর কোন চালের পরও খেলা চালিয়ে যেতে হয়।

এই খেলার জন্য কম কষ্ট করেননি তিনি। বাছাই পর্বের সময় বনানী থেকে পল্টনে যাতায়াতের জ্যাম এড়াতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ফেডারেশনেই কাটিয়েছেন। গাড়িটা যে নাতি-নাতনি আর পরিবারের দরকার, সেটাও তিনি ভেবেছেন। নিজের সুবিধার চেয়ে স্বজনের প্রয়োজনকে আগে রেখে বলেছেন, ‘একটু কষ্ট হলেও ফেডারেশনেই থেকেছি।’

প্রতিযোগিতার পথও মসৃণ ছিল না। আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার হওয়ায় এতদিন সরাসরি জাতীয় দাবায় খেলতেন তিনি। এবার ফেডারেশন সরাসরি সুযোগ দিয়েছে শুধু গত আসরের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপকে, তাই রানী হামিদকেও নামতে হয়েছে বাছাইয়ে। ৪৪ জনের ভিড়ে এক সময় ছিটকে পড়ার শঙ্কাও ছিল। নিজের খেলা নিয়ে বর্ষীয়ান এই দাবাড়ুর মূল্যায়ন নির্মোহ, ‘তেমন ভালো খেলতে পারিনি। শিরিনের সঙ্গে এত বাজে চাল দিয়ে হারলাম, খারাপ লেগেছে।’ শেষ পর্যন্ত কয়েকটি জয়ে টিকে গেছেন—এ যেন জীবনেরই প্রতিচ্ছবি, কোণঠাসা অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো।

ওদিকে বাছাইয়ের শীর্ষে উঠেছে নতুন প্রজন্ম। সমান সাত পয়েন্ট নিয়ে শিরিন, ওয়াদিফা আহমেদ ও ইশরাত জাহান দিবা যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছেন, ফল নির্ধারিত হয়েছে টাইব্রেকে। রানী হামিদের সঙ্গে সাড়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে আরও ছয়জন ছিলেন, আর শীর্ষ ১২ জন পেয়েছেন জাতীয় দাবার টিকিট। এই ভিড়ে একজন ৮৩ বছরের প্রবীণ নিজের জায়গা করে নিয়েছেন, লড়াই করে।

বছর দুই আগে হাঙ্গেরির দাবা অলিম্পিয়াডে টানা পাঁচ ম্যাচ জিতে রানী হামিদ চমকে দিয়েছিলেন সবাইকে। জাতীয় দাবার শীর্ষ পাঁচে থাকলে অলিম্পিয়াডে খেলার সুযোগ মেলে। কিন্তু তিনি এখন বাস্তববাদী, ‘এখন মেয়েরা অনেক ভালো খেলে। অলিম্পিয়াডের আশা করি না।’ এই দাবাড়ুর খেলার কারণ এখন ভিন্ন, ‘সময় কাটানো ও মনের আনন্দে খেলি।’

হয়তো এখানেই লুকিয়ে আছে শক্তির আসল রহস্য। দাবার বোর্ডে ৬৪ ঘর, আর সেই ঘরগুলোতে তিনি খুঁজে পান একটুখানি আশ্রয়, একটুখানি আনন্দ। শোক যখন ভারী হয়ে আসে, তখনো সেই বোর্ড তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে, ‘দাবা আমার জীবনের অংশ। যতদিন সুস্থ থাকব খেলব।’ কথাটা শুনলে মনে হয়, জীবন আসলে এমনই একটি খেলা, যেখানে জেতার চেয়ে বড় কথা হলো বোর্ডে বসে থাকা।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন