টকশোতে পেঁয়াজের দাম ও একজন কৃষকের কথা

: Sub Editor
: ১ মাস আগে

সপ্তাহ খানেক আগে গ্রামে গিয়েছিলাম। নাটোরে আমার নিজের গ্রামে। চায়ের দোকানে বসে গল্প হচ্ছিল। তখন পাশে একটা টিভিতে টকশো চলছিল। সেখানে  আলোচনা হচ্ছিল পেঁয়াজের দাম নিয়ে। পেঁয়াজের দাম কেনো বেড়ে গেলো। এভাবে দাম বাড়ানো উচিত হয়নি এমন আলোচনা শুনে পাশ থেকে একজন উঠে এসে অনেকটা রাগের স্বরেই আমাকে প্রশ্ন করলেন, এই যে যারা পেয়াজের দাম নিয়ে কথা বলছেন ওরা কি কৃষি কাজ কিছু বোঝে?  একটু দাম বাড়লেই ওদের চুলকানি শুরু হয়ে যায়। ওরা কি জানে এক কেজি পেয়াজ উৎপাদন করতে কত টাকা লাগে? এখন কত টাকা কেজি পেয়াজের দাম  হলে কৃষকরা বাঁচবে। না জেনে এরা মন গড়া কথা বলে।

আমি তখন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, দেখেন সারাদেশে জিনিসপত্রের দাম এতো বেড়ে গেছে যে সাধারণ মানুষ খুব বিপদে আছে। একারণে পেয়াজের বাড়তি দামটাও তারা মানতে পারছেন না। একারণে গণমাধ্যম হিসেবে তাদের একটু দায়িত্বও তো আছে। তখন তিনি প্রশ্ন করলেন, গণমাধ্যমের কি কৃষকের প্রতি কোনো দায়িত্ব নাই। আমি বললাম সেটাও  আছে। যাহোক এইযে ছোট্ট তক-বিতর্ক এরমধ্যে যে কতবড় সংকট লুকিয়ে আছে আমরা হয়তো তা টের পাচ্ছিনা। কৃষি উৎপাদন করতে গিয়ে কৃষকরা কীভাবে টিকে আছেন তা কিন্তু আমরা খুব কমই টের পাচ্ছি।

এবার আসা যাক, পেয়াজের দাম প্রসঙ্গে। যে মানুষটা টেলিভিশন আলোচনা শুনে ক্ষেপে গিয়েছিলেন তিনি একটি বড় কৃষি পরিবারের সন্তান। আমাদের গ্রামের প্রধান। তিনি কৃষির বহু কাল দেখেছেন। তারা জানেন কৃষির বিবর্তনটা কি। কিভাবে একেকটা বড় বড় কৃষি পরিবার এখন ছোট হয়ে গেছে। আবার ছোট কৃষি পরিবার বড়ও হয়েছে। তাই, এসব টেলিভিশন আলোচনা আর বাস্তবতায় যখন তারা মিল পান না তখন তারা ক্ষেপে যান বটে। এবারে নাটোর ও আশপাশের জেলায় পেয়াজ উৎপাদনে যে খরচ হয়েছে তাতে পেঁয়াজের দাম মিনিমাম ৪০ টাকা কেজি বা ১২০০টাকা মন হওয়া উচিত বলে মনে করেন কৃষকরা। তাতে তাদের কিছু লাভ হওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু পেয়াজ যদি ২০-২৫ টাকা কেজি বিক্রি করতে হয় তাহলে তাদের লোকসান গুনতে হবে। একারণে যখনই একটু দাম বাড়ছিল তখন কৃষকরা একটু খুশি ছিলেন। কারণ পেঁয়াজের এবারের  দামের ক্ষেত্রে পাইকারি আর খুচরায় দামের পার্থক্যটা সহনীয পর্যায়েই ছিল।

যা হোক পেঁয়াজের দাম নিয়ে আরো বেশ কজন কৃষকের সাথে কথা হয়েছিল। তারা বলছেন, আমদানি করা পেঁয়াজ যদি ১০০ টাকা কেজি কিনে খেতে পারেন তাহলে দেশের কৃষকের পেঁয়াজ ৫০টাকা কেজি উঠলেই কেনো এতো সমালোচনা হয়। প্রশ্নটা খু্বই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সময়টা এখন এতো অস্থির যে সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে একবার ব্যাগের দিকে আবার পকেটে দিকে তাকায়। তাই এখন কৃষককে নিয়ে মানবিক ভাবনা তাদের মাঝে খুব বেশি কাজ করেনা । আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ বাজার থেকে কিনতে গেলে যে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে তা কি কৃষকের ঘরে যায় আদৌ?

উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, হঠাৎ করেই বাজারে প্যাকেট লিকুইড দুধের দাম লিটারে ১০টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। কিন্তু সেই বাড়তি দাম কি তারা খামারিদের দিচ্ছে? আমি কথা বলে এমন কিছু পাইনি। বহুপণ্যের ক্ষেত্রেই এমন  ঘটছে। কৃষকের কাছ থেকে যেনোতেনো দামে কিনে নিচ্ছে কোম্পানিগুলো। কিন্তু ক্রেতারা তা কিনে খাচ্ছেন চড়া দামে। কারণ কোম্পানিগুলোর ভাবটা এমন যে আমরা কিনে নিচ্ছি সেটাইতো বেশি। মানে তারা কৃষকদের দয়া করছেন। একজন কৃষক যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, দিন-রাত এক করে একটি খাদ্যপণ্য উৎপাদন করছেন, তার উছিলায় আমাদের মুখ আল্লাহ খাবার তুলে দিচ্ছেন সেই কৃষককে সম্মান করার কথা এখন আর কেউ ভাবেই না। পারলে সুযোগ পেলে সেই কৃষককে চাষা বলেই একটা গালি দিতেও ছাড়েন না।

যাই হোক, সাম্প্রতিক শ্রীলংকার কথা উদাহরণ দিয়ে অনেকেই বলেন, বাংলাদেশও নাকি সেদিকেই যাচ্ছে। আমি মনে করি এটা সম্ভব না। কারণ আমাদের আছে লাখ লাখ শ্রমজীবী উৎপাদনের হাত। আমাদের আছে সোনাফলা ক্ষেত। যদি সেই ক্ষেতে ফসলটা আমরা করতে পারি আর ফসল ঠিকমত ঘরে তুলতে পারি তাহলে শ্রীলংকার শঙ্কা আমাদের স্পর্শ করবেনা। কিন্তু তার জন্য পরিকল্পনা লাগবে। কৃষককে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তার আগ্রহ আর উৎসাহকে বাড়াতে হবে। সে যেনো ফসল উৎপাদনে আগ্রহ না হারিয়ে ফেলে তা নিশ্চিত করতে হবে। আর সেই কাজটি করতে হবে সরকারকে। সেখানেই সরকারের দায়িত্ব। কৃষক যদি উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে শুধু লংকার শঙ্কা নয়, আরো বড় বিপদ আছে।

সাইদুল ইসলাম

সাংবাদিক