আবারও আলোচনায় দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত বালিশ কাণ্ডের ঘটনা। এবার সেই প্রসঙ্গ তুললেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ মঙ্গলবার (৫ মে) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার ২০২১-২২ অর্থবছরের ৩৮টি নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেন মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নূরুল ইসলাম। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলোচিত ‘বালিশ কাণ্ডে’ অডিট প্রতিবেদনও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানান।
প্রেস সচিব বলেন, ‘প্রতিটি বালিশের একরকম অবিশ্বাস্য দাম শুনে সিএজিকে কথার ছলে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘এই দামি বালিশের একটি জাদুঘরে রাখা উচিত’।’
তিনি বলেন, ‘শুধু বালিশ কাণ্ড নয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পর্দাকাণ্ড, বইকাণ্ড, টিনকাণ্ড, ইভিএমকাণ্ড সরকারি কেনাকাটায় একের পর এক এমন নানা দুর্নীতিকাণ্ডের খবর দীর্ঘদিন ধরেই জনগণের মুখে মুখে ফিরছে। প্রধানমন্ত্রী সব দুর্নীতির তথ্য উদঘাটন করে সংশ্লিষ্টদের বিচারের মুখোমুখি করার নির্দেশনা দিয়েছেন।’
প্রেস সচিব বলেন, ‘সিএজি যে প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেছেন তা পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।’
দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন: ২০১৯ সালের ১৬ মে ‘কেনা-তোলায় এত ঝাঁজ’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে রূপপুর প্রকল্পের কেনাকাটায় দুর্নীতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যা পরে সারা দেশে ‘বালিশ কাণ্ড’ নামে পরিচিতি পায়। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনটি সারা দেশে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল। এর ফলে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং মন্ত্রণালয়ের তদন্তের মধ্য দিয়ে মাস দুয়েকের মধ্যেই ওই দুর্নীতিকাণ্ডের বিচারে কিছুটা ইতিবাচক ফলও পাওয়া গিয়েছিল।
২০১৯ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ‘গ্রিন সিটি আবাসিক ভবনে’ আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী কেনাকাটায় অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ‘বালিশ কাণ্ড’ বা ‘বালিশ দুর্নীতির’ বিষয়টি সামনে আসে। প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, প্রকল্পের আবাসিক ভবনের জন্য ১৬৯ কোটি টাকার কেনাকাটায় ‘পদে পদে’ দুর্নীতি হয়েছে। একটি বালিশ কেনার পেছনে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ হাজার ৭১৭ টাকা। এর মধ্যে প্রতিটি বালিশের দাম দেখানো হয় ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। সেই বালিশ ফ্ল্যাটে ওঠানোর খরচ ৭৬০ টাকা দেখানো হয়।
এছাড়া কভারসহ প্রতিটি কমফোর্টারের (লেপ বা কম্বলের বিকল্প) দাম দেখানো হয় ১৬ হাজার ৮০০ টাকা। যদিও এর বাজারমূল্য সাড়ে ৪ হাজার থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। একইভাবে বিদেশি বিছানার চাদর কেনা হয়েছে ৫ হাজার ৯৩৬ টাকায়। অথচ এর বাজারমূল্য ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা বলে খবরে বলা হয়।
পাঁচটি ২০ তলা ভবনের জন্য এসব কেনাকাটা হয়েছে। প্রতিটি তলায় রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য কমফোর্টার শুধু বেশি দামে কেনাই হয়নি, কেনার পর দোকান থেকে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছাতে আলাদা ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছে। মাত্র ৩০টি কমফোর্টারের জন্য ৩০ হাজার টাকা ট্রাকভাড়া দেখানো হয়। একেকটি কমফোর্টার খাট পর্যন্ত তুলতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ হাজার ১৪৭ টাকা।
আবার কমফোর্টার ঠিকমত খাট পর্যন্ত তোলা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য তত্ত্বাবধানকারীর পারিশ্রমিক দেখানো হয়েছে প্রতিটির ক্ষেত্রে ১৪৩ টাকা। ঠিকাদারকে ১০ শতাংশ লাভ ধরে সম্পূরক শুল্কসহ সব মিলিয়ে প্রতিটি কমফোর্টারের জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ২২ হাজার ৫৮৭ টাকা।
শুধু কমফোর্টার নয়, চাদরের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে। ৩০টি চাদর আনতে ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি ট্রাক ভাড়া করা হয়েছে। আর ভবনের নিচ থেকে খাট পর্যন্ত তুলতে প্রতিটি চাদরের জন্য মজুরি দেখানো হয়েছে ৯৩১ টাকা।
শুধু বালি, কমফোর্টার বা চাদর নয়, ইলেকট্রনিক সামগ্রী কেনাকাটাতেও অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়। ভবনের প্রতি ফ্লাটের জন্য একটি রেফ্রিজারেটর কেনার খরচ দেখানো হয়েছে ৯৪ হাজার ২৫০ টাকা। রেফ্রিজারেটর ভবনে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৫২১ টাকা।
প্রতিটি টেলিভিশন কেনায় খরচ দেখানো হয়েছে ৮৬ হাজার ৯৭০ টাকা। টেলিভিশন ওপরে ওঠাতে দেখানো হয়েছে ৭ হাজার ৬৩৮ টাকার খরচ। এরকম বৈদ্যুতিক চুলা, বৈদ্যুতিক কেটলি, রুম পরিষ্কারের মেশিন, ইলেকট্রিক আয়রন, মাইক্রোওয়েভ ইত্যাদি কেনাকাটা ও ভবনে তুলতে অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়। একেকটি খাট কেনা দেখানো হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৫৭ টাকা। আর খাট ওপরে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ হাজার ৭৭৩ টাকা।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের বিস্তারিত থাকার কথা তুলে ধরেছেন সালেহ শিবলী। নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন।
অর্ধযুগেরও বেশি সময় আগের আলোচিত এই দুর্নীতির তদন্তের বিষয়টি এখনো দুদকে আটকে আছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এ ঘটনায় সে সময় অভিযুক্ত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল সংস্থাটি। এছাড়া একই অভিযোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী খন্দকার মো. আহসানুল হক, ফজলে হক, শাহনাজ আখতারকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং খোরশেদা ইয়াছরিবা নামে আরেক উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে নামিয়ে দেওয়া হয় নিচের পদে।
৩৬ টি অডিট ও হিসাব রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন : রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করার লক্ষে ৩৮টি অডিট (নিরীক্ষা) ও হিসাব রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নুরুল ইসলাম রিপোর্টগুলো উপস্থাপন করেন। এসব রিপোর্টে প্রাপ্ত পর্যবেক্ষণ, সুপারিশ সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। এসময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই বিশাল সংখ্যক অডিট রিপোর্ট পেশ করার মাধ্যমে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করা হয়েছে। এটি দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এই রিপোর্টগুলো গ্রহণ করার পর পরবর্তী ধাপগুলো হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ১২৮ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই রিপোর্টগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হবে এবং পরবর্তীতে তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে। এরপর সংসদীয় কমিটি রিপোর্টগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। যদি কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তলব করা এবং অর্থ আদায়ের সুপারিশ করা হবে।
এই ৩৮টি রিপোর্টের মধ্যে বিভিন্ন ক্যাটাগরির নিরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: বার্ষিক কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্ট: বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থায় প্রচলিত বিধি-বিধান প্রতিপালিত হয়েছে কিনা তা যাচাই করা হয়েছে। পারফরম্যান্স অডিট রিপোর্ট: সরকারের বিশেষায়িত প্রকল্প বা সেবার কার্যকারিতা এবং তা জনগণের কতটুকু কল্যাণে এসেছে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আর্থিক অডিট রিপোর্ট: সরকারের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঠিকতা যাচাই করা হয়েছে।
