‘মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম সেই অন্ধকার ঘরে। মনে হতো জীবন্ত কবরে আছি। বাইরে দিন না রাত, কিছুই বুঝতে পারতাম না। ভেবেছিলাম হয়তো ওখানেই মৃত্যু হবে।’ জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এভাবেই ‘আয়নাঘর’র রোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম।
রবিবার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের অষ্টম দিনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম বলেন, ‘এই সংসদকে বলতে হবে মজলুমদের মিলনমেলা। এখানে এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না, যে গত ফ্যাসিস্ট আমলে জুলুমের শিকার হয়নি। আমি সেই অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে এসেছি যেখানে আমার মতো আরও শত শত লোককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যারা আর ফিরে আসেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘একদিন রাতে যখন আমাকে বের করা হচ্ছিল, ভেবেছিলাম এখন আমাকে হত্যা করা হবে। আমি সূরা ইয়াসিন পাঠ শুরু করেছিলাম যাতে মৃত্যুটা সহজ হয়। কিন্তু পরে জানতে পারলাম কিছু কিশোরের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেওয়া পদক্ষেপ আমাদের আবারও দুনিয়ার আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।’ গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন আইন বাতিলের সুপারিশে স্তম্ভিত হয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘বাংলার মাটিতে যেন আর কোনোদিন এমন জুলুম না হয়, সেজন্য করা আইন কেন বাতিলের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে?’
আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান তার বক্তব্যে গুম প্রতিরোধে বর্তমান অর্ডিন্যান্সের সমালোচনা করে বলেন, উনারা যে আইন নিয়ে হইচই করছেন, সেটি হয়তো ভালো করে দেখেননি। আইসিটি অ্যাক্ট ১৯৭৩-এ গুমকে “ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি”র মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু বর্তমান অর্ডিন্যান্সে সাজা রাখা হয়েছে মাত্র ১০ বছর। এটি গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি এক ধরনের অবিচার।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘গুমের তদন্ত নিয়ে দ্বিমুখী নীতির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে আইসিটি অ্যাক্টে তদন্তের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে গুম আইনে ভিন্ন তদন্তের কথা বলা হচ্ছে। এই আইনটি বর্তমান অবস্থায় রাখা হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষজন সঠিক বিচার পাবেন না।’
সবশেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এই সংসদে এমন একটি কঠোর আইন পাস করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো কাউকে গুম বা খুনের শিকার হতে না হয়।’
অধিবেশনে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে দ্রুত কার্যকর আইনি কাঠামো তৈরির বিষয়ে একমত পোষণ করেন সংসদ সদস্যরা।
