গাজীপুর-৩ আসনে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো নিজ উপজেলার বাসিন্দাকে ধানের শীষের প্রার্থী পেয়েছে শ্রীপুরবাসী। ফলে ওই উপজেলার বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থক ও উপজেলাবাসীদের মধ্যে এক অন্যরকম আমেজ বিরাজ করছে। গাজীপুর-৩ আসনে শ্রীপুর উপজেলার বাসিন্দা হিসেবে প্রথম ধানের শীষের প্রার্থী হলেন ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। তাকে বিজয়ী করতে শ্রীপুরবাসীর প্রচারণা লক্ষ্য করার মতো।
এদিকে জোটকে ছাড় দেওয়ায় জামায়াতের দলীয় প্রার্থী না থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ধানের শীষের প্রার্থী ডা. বাচ্চু। সেই তুলনায় অন্য প্রার্থীদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো নয়।
গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর ও গাজীপুর সদরের তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত) এ আসন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গে আসনটি সম্পৃক্ত থাকায় বরাবরই অন্য উপজেলার বাসিন্দার একাধিক নেতা ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
স্বাধীনতার পর শ্রীপুর উপজেলার বাসিন্দা হিসেবে এবারই প্রথম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। তিনি একজন পেশাজীবী সংগঠনের নেতা হিসেবে বেশ পরিচিত এবং শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা।
আর প্রথমবারের মতো এ উপজেলায় ধানের শীষের প্রার্থী পেয়ে দল-মত নির্বিশেষে শ্রীপুরবাসী অবিরাম প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এবারই প্রথম শ্রীপুরের কৃতি সন্তান ডা. বাচ্চু ধানের শীষ প্রতীক পাওয়াই নেতাকর্মীদের সঙ্গে শ্রীপুরের সাধারণ জনগণও সম্পৃক্ত হয়েছে। তারা ধানের শীষকে বিজয়ী করতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রচার প্রচারণায় মরিয়া হয়ে উঠেছে।
এর আগে বিগত সবকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য কালিয়াকৈর উপজেলার বাসিন্দা চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী এবং একবার দলের যুগ্ম মহাসচিব গাজীপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা অধ্যাপক এমএ মান্নান বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। সরাসরি শ্রীপুরের কোনো সন্তান দলের প্রার্থী না থাকায় এ আসন থেকে বিগত দিনে কখনো বিএনপি বিজয় হতে পারেনি।
তেলিহাটি ইউনিয়ন বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শাজাহান মোড়ল বলেন, স্বাধীনতার পর এবারই দল শ্রীপুরের কৃতি সন্তানকে ধানের শীষের প্রার্থী দিয়েছে। ডা বাচ্চু একজন সৎ, নিরহংকারী, প্রাণবন্ত কর্মীবান্ধব মানুষ এবং চিকিৎসক হিসেবে এলাকায় তার ব্যাপক সুনাম রয়েছে। তাকে নমিনেশন দেওয়ায় দলের নেতাকর্মী, সমর্থকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে ডা. বাচ্চুর গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা প্রচার-প্রচারণা চালাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর ১ সপ্তাহ সময় অসুস্থতা জনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর রিলিজ পেয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন ডা. বাচ্চু। প্রতিদিন তিনি ১৫-১৬ টিরও বেশি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখছেন ডা. বাচ্চু। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হচ্ছে।
ডা. বাচ্চুর চিকিৎসক হিসেবে দেশের একজন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। এলাকায় দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণির অসুস্থ মানুষদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে ডা. বাচ্চুর কোনো তুলনা নেই। শুধু তার নির্বাচনি এলাকা নয়, সারা গাজীপুরের কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে, খবর পেলেই তার বাসায় কিংবা হাসপাতালে ছুটে যান তিনি। দল কিংবা গোত্র বিবেচনায় নয়, মানুষ হিসেবে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তিনি। আর এভাবেই তিনি দল মতের ঊর্ধ্বে এসে ব্যক্তি ডা. বাচ্চুই এলাকাবাসীর কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন। তাই এ আসনের ভোটাররা দলমত নির্বিশেষে ব্যক্তি ডাক্তার বাচ্চুকেই পছন্দের প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়ে, অদম্য প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন।
অধ্যাপক ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু দীর্ঘদিন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (ড্যাব) যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদেরও কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক এবং গাজীপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কেরও দায়িত্ব পালন করছেন। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে তিনি দলের নেতাকর্মীদের সব প্রকার বিভক্তির অবসান ঘটিয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করাতে সক্ষম হয়েছেন।
এদিকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের শ্রীপুর উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আব্দুস সাত্তার অর্ধশত নেতাকর্মী নিয়ে ধানের শীষের প্রার্থী ডা. বাচ্চুর হাত ধরে বিএনপিতে যোগদান করেছেন। এছাড়াও ইসলামিক দলগুলোর অনেক নেতাকর্মীদেরকেই ডা. বাচ্চুর হাত ধরে বিএনপিতে যোগদান করতে দেখা গেছে।
ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গ্রেফতার হয়ে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ আলোচনায় আসেন। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক পেয়ে ডা. বাচ্চু বলেন, দলকে ভালবেসে ফ্যাসিস্ট হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে দলের নেতাকর্মীদেরকে ঐক্যবদ্ধ রেখে কাজ করেছি। দল আমাকে ধানের শীষ প্রতীক দিয়ে সম্মানিত করেছেন। আমি এই এলাকার সর্বস্তরের জনগণের এবং দলীয় নেতাকর্মীদের প্রচেষ্টা ও ভালোবাসায় ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়ে এলাকার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করতে চাই।
এবারের নির্বাচনে গাজীপুর-৩ আসনে অপর প্রার্থীরা হলেন- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তথা ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ এহসানুল হক (রিকশা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আলমগীর হোসাইন (হাতপাখা), স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলন (ঘোড়া), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আশিকুল ইসলাম পিয়াল (মই), জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. নাজিম উদ্দিন (লাঙ্গল), ইসলামী ঐক্যজোটের হাফেজ মাওলানা মুফতি শামীম আহমেদ (মিনার)।
তবে ভোটারদের মতে এই সাতজনের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তথা ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ এহসানুল হকের মধ্যে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলন যদি গাজীপুর সদর উপজেলার তার নিজ এলাকার তিনটি ইউনিয়নের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারেন, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেন তিনিও। তবে এ আসনের অপর প্রার্থীদের তেমন প্রচার-প্রচারণা লক্ষ করা যাচ্ছে না।
জয়ের আশাবাদী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তথা ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ এহসানুল হক বলেন, জামায়াতসহ ১১ দলের সব নেতাকর্মীর প্রচেষ্টায় এবং ভোটারের পরিবর্তনের আশায় আমরা বিজয়ী হব ইনশাল্লাহ। আর দ্বীন কায়েমের জন্যই আমার রিকশা মার্কায় ভোট দেবে জনগণ।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আলমগীর হোসাইন বলেন, আমরা ভোটারের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি, যারা ইসলামকে ভালোবাসে তারা আমার হাত পাখায় ভোট দেবে বলে আমরা আশা করি।
ইসলামী ঐক্যজোটের হাফেজ মাওলানা মুফতি শামীম আহমেদ (মিনার) বলেন, ইসলাম কায়েমের জন্য আমরা ভোটারদেরকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছি।
তবে এ আসনে প্রচার প্রচারণা এবং নির্বাচনি কর্মতৎপরতায় সব দিক দিয়ে ধানের শীষের প্রার্থী ডা. বাচ্চু এগিয়ে রয়েছেন।
গাজীপুর-৩ সংসদীয় আসনে শ্রীপুর উপজেলার একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়ন এবং গাজীপুর সদর উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ২৭ হাজার ৩৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬০ হাজার ১৯০ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার সাত জন। মোট ভোট কেন্দ্র ১৮০ এবং ভোট কক্ষ ৯৮৯টি।
