জেলা-থানা নিয়ন্ত্রণ চেইন থাকবে না ইসলামী আন্দোলনের ছাত্রী উইংয়ে

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৩ এএম

প্রচলিত সাংগঠনিক কাঠামো থেকে কিছুটা ভিন্ন পদ্ধতিতে ছাত্রী উইং গড়ার পরিকল্পনা করছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি জেলা ও থানা পর্যায়ে কমিটি করা হলেও জেলা থেকে থানা এবং থানা থেকে অধস্তন ইউনিট নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত চেইন রাখা হবে না। নারীদের চলাফেরায় ইসলামী শরিয়াহর বিধিনিষেধ বিবেচনায় নিয়ে ছাত্রী সংগঠনের ফরম্যাট তাদের উপযোগী করে করা হবে। একই সঙ্গে এর কার্যক্রমে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক গুরুত্ব বেশি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আপাতত দলটির বিদ্যমান নারী ইউনিটের তত্ত্বাবধানে ছাত্রী সংগঠন পরিচালিত হবে এবং এর জন্য পৃথক নীতিমালা থাকবে।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মহিলা ও পরিবার বিষয়ক উপকমিটির বৈঠকে ছাত্রী উইংয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নিয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। তবে এখনো সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হয়নি। দলের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের মাধ্যমে নতুন এই উইংয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ডিসেম্বরের আগে, মূলত নভেম্বরে ঘোষণাটি দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব ও ছাত্রী সংগঠন গঠনের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে কালবেলার সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান।

শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, ১৩ সেপ্টেম্বর মহিলা ও পরিবার বিষয়ক উপকমিটির বৈঠকে ছাত্রী উইং আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অন্যান্য বিষয় গুছিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরের আগেই, মূলত নভেম্বর মাসের মধ্যে ছাত্রী উইং ঘোষণা করার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। দলের আমিরের দেশের বাইরে সফর থাকলে তার সফরের আগে বা পরে নভেম্বরে ঘোষণা দেওয়া হতে পারে।’

প্রচলিত জেলা-থানা নিয়ন্ত্রণ চেইন থাকবে না

ছাত্রী উইংয়ের সাংগঠনিক কাঠামোতে জেলা ও থানা পর্যায়ের কমিটি থাকলেও সেগুলোর মধ্যে প্রচলিত নিয়ন্ত্রণ চেইন না রাখার পরিকল্পনাটিই উদ্যোগটির অন্যতম ‘ব্যতিক্রমী’ দিক। শুরুতে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হবে। পরে জেলা ও থানা পর্যায়ে কমিটি করা হলেও জেলা থেকে থানা এবং থানা থেকে অধস্তন ইউনিট নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক কাঠামো রাখা হবে না। একই সঙ্গে ছাত্রী সংগঠনের ফরম্যাট তাদের উপযোগী করে তৈরি করা হবে এবং এর কার্যক্রমে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক গুরুত্ব বেশি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ বিষয়ে শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, ‘আমাদের ছাত্রী উইংয়ের ফরম্যাটটা একটু ভিন্নতর হবে। কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হবে। তাদের ফরম্যাট হবে। পরে আমাদের জেলা এবং থানা পর্যায়ের কমিটিগুলো হবে। তবে সেগুলো অন্য প্রক্রিয়ায় করব। আমরা চাচ্ছি, মেয়েদের চলাফেরার ক্ষেত্রে শরিয়াহর যে বিধিনিষেধ আছে, সেটা যেন রক্ষা হয়। তাই আমরা চেষ্টা করব ছাত্রী উইংয়ের চেইনটা এরকম হবে না যে, জেলা থেকে থানা নিয়ন্ত্রণ, থানা থেকে অধস্তন কমিটি নিয়ন্ত্রণ। বরং জেলা পর্যায়ের কার্যক্রম জেলাতেই সম্পন্ন করা যায়, এরকম একটা ফরম্যাট আসবে ইনশাআল্লাহ।  আমাদের ছাত্রী সংগঠনের ফরম্যাট তাদের উপযোগী করে করা হবে এবং এটা ক্যাম্পাসকেন্দ্রীক গুরুত্ব বেশি পাবে।’

অর্থাৎ, কেন্দ্র থেকে জেলা, জেলা থেকে থানা—এভাবে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের পরিবর্তে নারীদের চলাফেরা ও কার্যক্রমের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে আলাদা পদ্ধতিতে স্থানীয় কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করছে দলটি। একই সঙ্গে ছাত্রীদের জন্য উপযোগী কাঠামো তৈরি করে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক কার্যক্রমে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

পৃথক নীতিমালা, তবে নারী ইউনিটের তত্ত্বাবধানে

ছাত্রী উইংয়ের নিজস্ব নীতিমালা থাকবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, ‘আমাদের সব সহযোগী সংগঠনেরই পৃথক পৃথক গঠনতন্ত্র আছে। সেই হিসাবে আমাদের যে ছাত্রী সংগঠন হচ্ছে, তাদেরও পৃথক নীতিমালা থাকবে। সেই নীতিমালার আলোকে তারা পরিচালিত হবে। তবে আপাতত আমাদের সিদ্ধান্ত, আমাদের যে নারী ইউনিট আছে, সেই ইউনিটের তত্ত্বাবধানে ছাত্রী সংগঠন পরিচালিত হবে। তবে ছাত্রী সংগঠনের গঠনতন্ত্র বা নীতিমালা আলাদাভাবে থাকবে।’

তিনি জানান, ছাত্রী উইংয়ের কর্মক্ষেত্র, নীতিমালা ও কর্মসূচিতে স্বাতন্ত্র্য থাকবে। একই সঙ্গে শরিয়াহর বিধান যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা রাখা হবে।

নেতৃত্বে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই

কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতাদের পরামর্শ অনুযায়ী শীর্ষ নেতৃত্ব মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। পরে নীতিমালা তৈরি করে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে এখনো নির্দিষ্ট কারও নাম চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান শেখ ফজলে বারী মাসউদ। তার ভাষ্য, ইসলামী আন্দোলনের বর্তমান নারী শাখা অথবা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছাত্রীদের মধ্য থেকে যোগ্য নেতৃত্ব নেওয়া হতে পারে। তবে বর্তমান নারী শাখা থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি বেশি আলোচনায় রয়েছে।

নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় নাকি কওমি মাদ্রাসা—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না বলেও জানান তিনি। যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় যারা উঠে আসবেন, তারাই দায়িত্ব পাবেন।

তিন ধারার ছাত্রীদের সমন্বয়

প্রস্তাবিত ছাত্রী উইংয়ে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা, কওমি মাদ্রাসা ও আলিয়া মাদ্রাসা—এই তিন ধারার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রীদের পাশাপাশি কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও এর সাংগঠনিক কাঠামোয় যুক্ত হতে পারবেন।

এ বিষয়ে দলের দায়িত্বশীলদের পরিকল্পনা হলো, শিক্ষাব্যবস্থার ভিন্ন ধারার ছাত্রীদের এক প্ল্যাটফর্মে এনে সংগঠনটির কার্যক্রম বিস্তৃত করা। নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও কোনো একটি শিক্ষাধারাকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।

দাওয়াহ থেকে নারী ভোটারের সঙ্গে সমন্বয়

ছাত্রী উইংয়ের লক্ষ্য শুধু নারী শিক্ষার্থীদের সাংগঠনিকভাবে যুক্ত করা নয়। ছাত্রীদের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া, নারীদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে সক্রিয় করা এবং দেশের বিপুলসংখ্যক নারী ভোটারের সঙ্গে কার্যকর লিয়াজোঁ ও সমন্বয় তৈরি করাকেও এর উদ্দেশ্য হিসেবে দেখছে ইসলামী আন্দোলন।

শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটার সংখ্যায় বেশি। তাই সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নারী সমাজ যাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করা এবং নারীদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করাও ছাত্রী উইংয়ের লক্ষ্য।

তার বক্তব্য, ‘ইসলামী শরিয়াহ অনুসরণের মাধ্যমে নারীরা যেন ব্যক্তি গঠন, সমাজ গঠন ও রাষ্ট্র গঠনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারেন, সে লক্ষ্যে কাজ করবে সংগঠনটি।’

শরিয়াহকে সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখছে দলটি

ছাত্রী উইংয়ের স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম প্রধান জায়গা হিসেবে শরিয়াহ অনুসরণের বিষয়টিকে দেখছে ইসলামী আন্দোলন। দলের দায়িত্বশীল নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের মূল সংগঠনের যে ধরনের বাহ্যিক স্বাতন্ত্র্য রয়েছে, প্রস্তাবিত নারী সংগঠনের ক্ষেত্রেও কর্মক্ষেত্র, নীতিমালা ও কর্মসূচিতে তেমন স্বাতন্ত্র্য থাকবে।

শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, ‘নারী বা ছাত্রীদের অন্য সংগঠনগুলোর মধ্যে শরিয়াহ পালনের ক্ষেত্রে যে ধরনের শিথিলতা দেখা যায় বলে তারা মনে করেন, ইসলামী আন্দোলন তা করবে না। শরিয়াহ অনুসরণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেই ছাত্রী উইং পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।’

দলের মহিলা ও পরিবার বিষয়ক উপকমিটির ১৩ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে শুধু ছাত্রী উইংয়ের ঘোষণা নয়, দেশব্যাপী নারী সদস্যদের সক্রিয় করা এবং নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ছাত্রী উইংয়ের কাঠামো ও নীতিমালা গুছিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার নির্ধারিত দিন বা তারিখ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। 

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন