তিন মাসে ‘মব’ সহিংসতায় ৪৯ জন নিহত, রাজনৈতিক হানাহানিতে ৩৬

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম

চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) সারা দেশে ‘মব’ সহিংসতায় ৪৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছেন ৩৬ জন। গত তিন মাসে ৬৭০ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪৭ জন। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’র (এইচআরএসএস) ত্রৈমাসিক পর্যালোচনায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। আজ রবিবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে এইচআরএসএস।

এতে বলা হয় জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজনেতিক ও নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৩৬ জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৪০৭৮ জনের অধিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। নিহত ৩৬ জনের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন, জামায়াতের ৪ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন ও অন্যান্য দলের ৩ জন। ৬১০টি সহিংসতার ঘটনার ৫৭৩ টিই (৯৪%) ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৯৪ টি ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ১ হাজার ৫৮৫ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক ৩৯৫টি সহিংসতার ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ৬০০ টিরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

নিহত ১২ জনের মধ্যে বিএনপির ৮ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন, জামায়াতের ২ জন এবং রাজনৈতিক পরিচয় অজানা ১ জনের।

প্রতিবেদনে গত তিন মাসে সাংবাদিক নির্যাতন ও নীপিড়নের ৮২ ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে বলা হয়, হামলার ঘটনায় ১৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১২২ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ২০ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ২১ জন সাংবাদিক। ২ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর অধীনে ৮ জন সাংবাদিককে আসামি করে পৃথক দুইটি মামলা হয়েছে।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত তিন মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতায় সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৮৮টি ঘটনায় ৪৯ জন নিহত ও ৮০ জন আহত হয়েছেন।

আর এ সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ২৭টি হামলার ঘটনায় ৩১ জন আহত হয়েছেন এবং ৪টি মন্দির, ২টি প্রতিমা ও ১৯টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া জমি দখলের ৩টি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ১০টি ঘটনা ঘটেছে। 

আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে এইচআরএসএস’র পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গত তিন মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ এবং কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’র ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হেফাজতে ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ৫ জন, গুলিবিদ্ধ হয়ে ১ জন এবং বন্দুকযুদ্ধে ১ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া কারা হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসক জানায়, বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৩৯ জন আসামি মারা গেছেন। ৩৯ জনের মধ্যে ১৬ জন কয়েদী ও ২৩ জন হাজতি। এর মধ্যে ১২ জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের এবং ২৭ জন সাধারণ কয়েদী। এ ছাড়া গত তিন মাসে ১৩৯ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ৩০ জন নিহত ও ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসে ৬৭০ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪৭ জন, যাদের মধ্যে ৭৬ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। ৩৯ জন নারী ও কন্যা শিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৯ জনকে। এ ছাড়া তিন মাসে ১৮০ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৪২ জন। এইচআরএসএস’র পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, তিন মাসে ৩২৮ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ১৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনমাসে সারা দেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে ৬ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।

এইচআরএসএস’র নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

 

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন